চিলমারীতে ব্রহ্মপুত্রের তীর রক্ষা বাঁধে ফের ধস, হুমকিতে শতাধিক গ্রাম

কুড়িগ্রামের চিলমারীতে ব্রহ্মপুত্র নদের ডান তীর রক্ষা প্রকল্প ও শহর রক্ষা বাঁধে আবারও ধস দেখা দিয়েছে। এতে বসতবাড়ি, আবাদি জমি, গুরুত্বপূর্ণ সড়কসহ শতাধিক গ্রাম ও চিলমারী উপজেলা শহর হুমকির মুখে পড়েছে।
বাঁধের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় ফাটল দেখা দেওয়ায় যেকোনো সময় আরও অংশ নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। বারবার ধসের পরও স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় নদীভাঙনের আতঙ্কে দিন কাটছে এলাকাবাসীর।
শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরে উপজেলার রানীগঞ্জ ইউনিয়নের কাঁচকোল কেডিওয়ারী এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, ধসে যাওয়া বাঁধের পাশ দিয়ে তীব্র স্রোতে নদীর পানি আছড়ে পড়ছে। বাঁধের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় ফাটল তৈরি হয়েছে।
এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে প্রায় ৪০ মিটার বাঁধ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এতে আশপাশের বসতবাড়ি, আবাদি জমি ও স্থানীয় সড়ক নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কাঁচকোল টি-বাঁধ থেকে কেডিওয়ারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকায় শহর রক্ষা বাঁধ ও ব্রহ্মপুত্রের ডান তীর রক্ষা প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এর বিভিন্ন স্থানে একাধিকবার ধস ও ফাটল দেখা দিয়েছে। ফকিরেরহাট থেকে কাঁচকোল এলাকার মধ্যবর্তী অংশে সম্প্রতি চার দফায় প্রায় ২০০ মিটার ব্লক পিচিং নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকায় ফাটলও সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত অংশে জরুরি মেরামতের জন্য চার দফায় মোট ২৪ হাজার জিওব্যাগ বরাদ্দ দেওয়া হলেও ভাঙন ও ধসের ঝুঁকি কাটেনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ধস দেখা দেওয়ার পর পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে জিওব্যাগ ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হলেও অনেক ক্ষেত্রে যথাসময়ে ও পরিকল্পিতভাবে কাজ করা হচ্ছে না। নির্ধারিত স্থানে যথাযথভাবে জিওব্যাগ ফেলা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে অস্থায়ী মেরামতের পরও ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। কাঁচকোল বাজার থেকে ফকিরেরহাট বাজার পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল করিম বলেন, ‘রাতেই বিকট শব্দে বাঁধ ভেঙে নদীতে চলে যায়। এখন আমাদের বাড়িঘর নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় আছি। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পুরো এলাকা নদীতে বিলীন হয়ে যাবে।’
এর আগে গত ২৮ জুলাই কাঁচকোল-সড়কটারী এলাকায় ব্রহ্মপুত্রের ডান তীর রক্ষা বাঁধ সংরক্ষণ এবং নদীভাঙন ঠেকাতে স্থায়ী সিসি ব্লক বাঁধ নির্মাণের দাবিতে মানববন্ধন করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ময়নার খামার যুব সংঘ ও এলাকাবাসীর উদ্যোগে আয়োজিত ওই কর্মসূচিতে শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
বক্তারা জানান, বছরের পর বছর নদীভাঙনে বসতভিটা, আবাদি জমি, সড়ক ও বিভিন্ন স্থাপনা হুমকির মুখে পড়েছে। ইতোমধ্যে অনেক পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।
বক্তারা আরও বলেন, কাঁচকোল-ফকিরেরহাট সড়কটি এলাকার মানুষের চলাচল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত, কৃষিপণ্য পরিবহন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নদীভাঙন অব্যাহত থাকলে এ যোগাযোগব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই অস্থায়ী সংস্কারের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় স্থায়ী সিসি ব্লক বাঁধ নির্মাণের দাবি জানান তাঁরা।
মানববন্ধনে বক্তব্য দেন ময়নার খামার যুব সংঘের উপদেষ্টা মোছা. নিহারিকা শারমিন (দীপি), সভাপতি মো. মজিদুল হক মুকুল মণ্ডল, সহসভাপতি মো. মঞ্জু মিয়া, সাধারণ সম্পাদক মো. হিরন মণ্ডল এবং মাদরাসার সুপার মাওলানা শমসের আলীসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
কর্মসূচি শেষে স্থানীয় প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কাছে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে স্মারকলিপি দেওয়ার ঘোষণা দেন আয়োজকেরা।
এদিকে বাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সংরক্ষিত মহিলা সংসদ সদস্যের প্রতিনিধিদল। সংরক্ষিত মহিলা সংসদ সদস্যের প্রতিনিধি অধ্যাপক ফজলুল হক বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ স্থানটি জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ফেলে রক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিবুল হাসান বলেন, কাঁচকোল কেডিওয়ারী এলাকার ৪ দশমিক ১ কিলোমিটার ঝুঁকিপূর্ণ তীর সংরক্ষণের জন্য একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) দাখিল করা হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদন ও বাস্তবায়ন হলে দীর্ঘমেয়াদে এই ভাঙন সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা করছেন তিনি।
স্থানীয়দের দাবি, শুধু জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ফেলে সাময়িকভাবে ভাঙন ঠেকানোর পরিবর্তে দ্রুত স্থায়ী ও টেকসই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তাদের আশঙ্কা, সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে বসতভিটা, ফসলি জমি ও যোগাযোগব্যবস্থা হারানোর পাশাপাশি চিলমারী উপজেলা শহরসহ বিস্তীর্ণ জনপদ ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।
ভোরের আকাশ/ ইউএম