মেহেরপুরে হ্যাকার চক্রের ফাঁদে বয়স্ক প্রতিবন্ধী ওবিধবা ভাতাভোগীরা

সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় দেওয়া বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতার টাকা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (বিকাশ)-এর অ্যাকাউন্ট থেকে অভিনব কায়দায় হাতিয়ে নিচ্ছে একটি প্রতারক চক্র।
মেহেরপুর সদর উপজেলায় এই চক্রের খপ্পরে পড়ে অসহায় ও প্রান্তিক মানুষগুলো চরম দুরবস্থায় পড়েছেন। ভাতার সামান্য টাকায় ওষুধ কেনা ও সংসার চালানো মানুষগুলোর এই কষ্টের টাকা চোখের পলকেই তুলে নিচ্ছে হ্যাকাররা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রতারক চক্রটি নিজেদের উপজেলা অফিস বা সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে সুবিধাভোগীদের ফোন করে। এরপর ‘ফ্যামিলি কার্ড’ করে দেওয়া বা ভাতার টাকার সাথে আরও অতিরিক্ত টাকা পাইয়ে দেওয়ার লোভ দেখিয়ে কৌশলে ওটিপি (OTP) বা পিন নম্বর জেনে নেয়। আর এই পিন নম্বর পাওয়ার সাথে সাথেই অ্যাকাউন্ট থেকে সম্পূর্ণ টাকা হাওয়া হয়ে যায়। ভুক্তভোগীদের বিবরণ থেকে এই প্রতারণার ভয়ংকর চিত্র উঠে এসেছে
বিধবা ময়না খাতুনের আকুতি, ভাতার টাকা দিয়েই পেটের আলসারের ওষুধ কেনেন বয়োবৃদ্ধ বিধবা ময়না খাতুন। তার ছেলে জানান, একটি অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন করে জানানো হয়—উপজেলা থেকে ফ্যামিলি কার্ড ও ভাতার বকেয়া টাকা বাবদ একসাথে ৮ হাজার টাকা দেওয়া হবে। না বুঝে একটি ওটিপি নম্বর অন্য একজনের মাধ্যমে জানানোর সাথে সাথেই অ্যাকাউন্ট থেকে সব টাকা কেটে নেওয়া হয়।
বয়স্ক ভাতাভোগী আবুল হোসেন পরিশ্রম করতে না পারা এই বৃদ্ধ জানান, তার ভাতার টাকা সরকারের পক্ষ থেকে আসার পরপরই পরপর দুইবার অজ্ঞাত কেউ তুলে নিয়েছে। এই টাকা দিয়েই তার ওষুধ ও সংসার চলত। যারা এ ধরনের কাজ করছে ঠিক করছে না আমাদের মতন অসহায় লোককে নিঃস্ব করে দিচ্ছে। এখন তিনি চরম বিপদে দিন কাটাচ্ছেন।
প্রতিবন্ধী ভাতাভোগী শফিকুলের স্ত্রী জানান, ফ্যামিলি কার্ড ও ৫ হাজার টাকা অতিরিক্ত দেওয়ার কথা বলে প্রতারকরা কৌশলে তার স্বামীর কাছ থেকে মোবাইল নম্বর ও পিন কোড জেনে নেয়। এর মাত্র পাঁচ মিনিটের ব্যবধানে অ্যাকাউন্ট চেক করে দেখা যায়, জমানো সব টাকা গায়েব হয়ে গেছে। এই টাকা দিয়ে আমাদের সংসারের কিছু উপকার হয়। সে সাথে ওষুধ পত্র কেনা হয়।
মেহেরপুর সদর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আনিসুর রহমান জানান, সদরে বর্তমানে বয়স্ক ভাতাভোগী ৯,৫৬০ জন, বিধবা ভাতাভোগী ৩,৮৩৩ জন, প্রতিবন্ধী ভাতাভোগী ৫,৬৮৬ জন এবং ১৩ জন হিজড়া ভাতা পাচ্ছেন। এছাড়া অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর বিশেষ ভাতার আওতায় ৭৩ জন এবং চার স্তরে ৭৪ জন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী এই সুবিধার অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন ।সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই সুবিধাভোগীদের তালিকা পাঠানো হয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে সরাসরি তাদের বিকাশ অ্যাকাউন্টে টাকা পৌঁছে যায়।
এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “এই নম্বরগুলো হ্যাকাররা কীভাবে পায়, তা আমাদের বোধগম্য নয়। যদি কোনো ব্যক্তির ফোন নম্বর বা অ্যাকাউন্ট একবার হ্যাকিংয়ের শিকার হয়, তবে আমাদের পরামর্শ হলো অবিলম্বে নম্বরটি পরিবর্তন করে ফেলা। এছাড়া আইনগত পদক্ষেপ হিসেবে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নেওয়া আমাদের একমাত্র উপায়।
প্রান্তিক মানুষের জীবন বাঁচানোর এই সামাজিক নিরাপত্তা ভাতার টাকা সুরক্ষায় দ্রুত এই সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রকে আইনের আওতায় এনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও সচেতন মহল।
ভোরের আকাশ/সু.পা