যৌথবাহিনীর ক্যাম্পের পানির লাইনে বিষাক্ত রাসায়নিক মেশানোর অভিযোগে মামলা

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় স্থাপিত যৌথবাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্পের পানির সরবরাহ লাইনে বিষাক্ত রাসায়নিক মেশানোর ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। ঘটনার পর পুরো এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে এবং পানির নমুনা পরীক্ষার জন্য পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, এটি পরিকল্পিত নাশকতার অংশ হতে পারে।
রোববার (২৬ জুলাই) রাতে সীতাকুণ্ড থানায় ৩৪ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও ২০ থেকে ২৫ জনকে আসামি করে মামলাটি দায়ের করা হয়। মামলায় স্থানীয় একটি সন্ত্রাসী চক্রের প্রধান হিসেবে পরিচিত ইয়াসিনকেও আসামি করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. নাজিম উদ্দিন জানান, ঘটনার পর তদন্তে দেখা যায়, যৌথবাহিনীর ব্যবহৃত পানির সরবরাহ লাইন পরিকল্পিতভাবে কেটে সেখানে বিষাক্ত রাসায়নিক প্রবেশ করানো হয়েছে। পরে পাইপটি প্লাস্টিক দিয়ে মুড়িয়ে আগের অবস্থায় রেখে দেওয়া হয়, যাতে বিষয়টি সহজে বোঝা না যায়।
তিনি বলেন, একই উৎস থেকে দুটি পৃথক পানির লাইন গেছে একটি স্থানীয় একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দিকে এবং অন্যটি যৌথবাহিনীর ক্যাম্পে। দুর্বৃত্তরা ক্যাম্পমুখী লাইনের ভালভ বন্ধ করে পাইপ কেটে রাসায়নিক ঢুকিয়ে পুনরায় সংযোগ দেয়। প্রাথমিক তদন্তে এটি সুপরিকল্পিত নাশকতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ডিআইজি আরও বলেন, জঙ্গল সলিমপুরে যৌথবাহিনীর অবস্থান মেনে নিতে না পেরে একটি সশস্ত্র চক্র বিভিন্ন সময় নাশকতার চেষ্টা করেছে। অতীতেও ক্যাম্পের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা, টহল কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি, হামলার চেষ্টা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ভয়ভীতি দেখানোর মতো ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ পানির লাইনে বিষাক্ত পদার্থ মেশানোর ঘটনা সেই ধারাবাহিকতার অংশ কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ঘটনার সময় ক্যাম্পে দায়িত্বে থাকা কয়েকজন সদস্য পানি পান করতে গিয়ে দুর্গন্ধ অনুভব করেন এবং পানিতে অস্বাভাবিক সাদা ফেনা দেখতে পান। এতে তাদের সন্দেহ হলে তারা তাৎক্ষণিকভাবে পানি ব্যবহার বন্ধ করে দেন। পরে সংরক্ষণ ট্যাংক এবং সরবরাহ লাইনে একই ধরনের ফেনা দেখা যায়। ঘটনাস্থলের কাছ থেকে একটি খালি রাসায়নিকের পাত্রও উদ্ধার করা হয়েছে, যা পরীক্ষার জন্য জব্দ করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, ক্যাম্পের তিন থেকে চারজন সদস্য সামান্য অসুস্থ হয়ে পড়লেও দ্রুত প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং বর্তমানে তারা সুস্থ আছেন। কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি।
সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহিনুল ইসলাম বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। মামলার তদন্তে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে এবং প্রযুক্তিগত তথ্যও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা না গেলেও অভিযুক্তদের অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পানির নমুনা রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। পরীক্ষার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কী ধরনের বিষাক্ত পদার্থ ব্যবহার করা হয়েছে এবং সেটি মানবদেহের জন্য কতটা ক্ষতিকর—তা নিশ্চিত হওয়া যাবে। একই সঙ্গে উদ্ধার হওয়া রাসায়নিকের পাত্র থেকেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার আশা করছেন তদন্তকারীরা।
চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘদিন ধরেই ভূমি দখল, আধিপত্য বিস্তার এবং সশস্ত্র সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য আলোচিত। বিভিন্ন সময়ে এখানে একাধিক সন্ত্রাসী গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ, চাঁদাবাজি, অবৈধ স্থাপনা নিয়ন্ত্রণ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে।
এসব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার কয়েক দফায় পুলিশ, র্যাব, সেনাবাহিনী ও অন্যান্য বাহিনীর সমন্বয়ে যৌথ অভিযান পরিচালনা করে। অভিযান চলাকালে বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার, সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার এবং অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের মতো কার্যক্রমও পরিচালিত হয়েছে। ওই ধারাবাহিকতায় এলাকায় যৌথবাহিনীর ক্যাম্প স্থাপন করা হয়, যাতে সন্ত্রাসী কার্যক্রম দমন এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, যৌথবাহিনীর উপস্থিতির কারণে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা অনেকটাই সীমিত হয়েছে। তবে মাঝেমধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে নাশকতার চেষ্টা ও ভয়ভীতি সৃষ্টির ঘটনা ঘটছে, যা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
ঘটনার পর ক্যাম্প ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে। পানির সরবরাহ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সংযোগ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে অতিরিক্ত নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত পানির সরবরাহ ব্যবস্থায় বিশেষ সতর্কতা বজায় রাখা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলেছেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে সব ধরনের তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের নাশকতা ঠেকাতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা হবে।
ভোরের আকাশ/এনউব