সৈয়দপুরে প্রতিরক্ষা বাঁধে কমছে নদীভাঙন, বদলাচ্ছে উত্তর জনপদের চিত্র

বর্ষা এলেই নদীভাঙন, বন্যা ও ফসলি জমি হারানোর আতঙ্ক—উত্তর জনপদের নদীতীরবর্তী মানুষের কাছে যেন এটাই ছিল চিরচেনা বাস্তবতা। নদীর আগ্রাসনে কখনো বসতবাড়ি, কখনো কৃষিজমি, আবার কখনো শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হুমকির মুখে পড়ত। সেই দুর্ভোগ থেকে ধীরে ধীরে মুক্তির পথে এগোচ্ছেন নীলফামারীর সৈয়দপুর, কিশোরগঞ্জ, তারাগঞ্জ, বদরগঞ্জ ও পার্বতীপুরের নদীতীরবর্তী এলাকার মানুষ।
নদীভাঙন রোধ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেচব্যবস্থার উন্নয়নে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাস্তবায়নাধীন এনডিআর (নদী উন্নয়ন ও পুনর্বাসন) বাজেটের আওতায় বিভিন্ন কাজ ইতোমধ্যে সুফল দিতে শুরু করেছে। বিশেষ করে নদীতীর সংরক্ষণে প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও জিও ব্যাগ ডাম্পিংয়ের ফলে ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলোতে মানুষের মধ্যে ফিরেছে স্বস্তি। একই সঙ্গে সাইফুন নির্মাণ ও মেরামতের মাধ্যমে সেচব্যবস্থাপনায়ও তৈরি হচ্ছে নতুন সম্ভাবনা। এতে উত্তর জনপদের কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্ট দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সৈয়দপুর পানি উন্নয়ন বিভাগের তত্ত্বাবধানে এনডিআর বাজেটের আওতায় ৯৯৩ দশমিক ৬০ মিটার নদীতীর রক্ষা বাঁধ, সাতটি সাইফুন নির্মাণ এবং দুটি আবাসিক কলোনির বিভিন্ন সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজসহ বিভিন্ন খাতে মোট ৪ কোটি ৫ লাখ ৮৪ হাজার টাকা ব্যয় করা হয়েছে।
এনডিআর বাজেটের আওতায় সৈয়দপুর ও পার্শ্ববর্তী এলাকার আটটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নদীতীর সংরক্ষণ ও প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে বোতলাগাড়ী ইউনিয়নের কাঠারীপাড়ায় খড়খড়িয়া নদীর বাম তীরে ৯০ মিটার, বুড়িরহাট রহিমাপুর মণ্ডলপাড়া এলাকায় যমুনাশ্বরী নদীর ডান তীরে ১৯০ মিটার এবং বেলতলী বাজার ব্রিজের অ্যাপ্রোচ ও সংযোগ সড়ক রক্ষায় চাড়ালকাঠা নদীতে ১০০ মিটার সতর্কতামূলক বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া বাহাগিলী ইউনিয়নের সন্ন্যাসীপাড়ার গুচ্ছগ্রাম রক্ষায় যমুনাশ্বরী নদীর ডান তীরে ৭৫ মিটার এবং চাড়ালকাঠা নদীর উত্তর দুরাকুঠি এলাকায় ডান তীরে ১০০ মিটার প্রতিরক্ষা ও মেরামতের কাজ করা হয়েছে। বেলাইচণ্ডী ইউনিয়নের কাঠারীপাড়া এলাকায় খড়খড়িয়া নদীর বাম তীরে ১৬৬ দশমিক ৬০ মিটার, ময়নাকুড়ি এলাকায় যমুনাশ্বরী নদীর ডান তীরে ৮০ মিটার এবং মধুপুর ইউনিয়নের রাজারামপুর গ্রামের গোবরাগাড়ী এলাকায় নদীর বাম তীরে ১৯২ মিটার প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। এসব নদীতীর সংরক্ষণ কাজে মোট ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ৯৬ লাখ ২০ হাজার টাকা।
সরেজমিনে এনডিআরের আওতায় বাস্তবায়িত এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বাঁধ নির্মাণে মাটি যথাযথভাবে কমপ্যাক্ট করার পর জিও-টেক্সটাইল ফেব্রিক ও ঘানিব্যাগ বিছানো হয়েছে। এর ওপর নির্ধারিত ৭৫ কেজি ওজনের জিও ব্যাগ স্থাপন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এনডিআর বাজেটের আওতায় কাজের সিডিউল অনুযায়ী এসব কাজ বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
শুধু নদীভাঙন রোধ নয়, কৃষির জন্য সেচব্যবস্থার উন্নয়নেও এর আওতায় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। সাতটি সাইফুন নির্মাণ ও একটি সাইফুন মেরামতের কাজে ব্যয় হয়েছে ৮৪ লাখ ৭০ হাজার টাকা। এর মধ্যে টি১এস৯ডি সেচখালে একটি, টি১এসডি সেচখালে একটি (দুই ডেন্ট), টিএ১বি সেচখালে তিনটি এবং এস৫আর সেচখালে একটি সাইফুন নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি টি২এস৫আর সেচখালে একটি সাইফুন মেরামত করা হয়েছে।
এনডিআর বাজেটের আওতায় বাস্তবায়িত এলাকার বাহাগিলী সন্ন্যাসীপাড়ার কৃষক নুর হোসেন ও আব্দুল আজিজ, বোতলাগাড়ী কাঠারীপাড়ার বাসিন্দা জুলফিকার রহমান ও বাবুল হোসেন এবং বেলাইচণ্ডী কাঠারীপাড়ার ইলিয়াস ও ফজলু বলেন, আগে বর্ষা মৌসুম এলেই নদীভাঙনের আতঙ্কে দিন কাটাতে হতো। নদীর পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বসতবাড়ি, ফসলি জমি, চলাচলের রাস্তা ও বিভিন্ন স্থাপনা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হতো।
তাঁরা বলেন, প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণের পর পরিস্থিতির অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে। বাঁধ নির্মাণের ফলে শুধু নদীভাঙন ঠেকানোই নয়, এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা, বসতবাড়ি ও কৃষিজমিও সুরক্ষিত হয়েছে। কাজের মান নিয়েও তাঁরা সন্তোষ প্রকাশ করেন।
আবাসিক কলোনিতেও সংস্কার
এনডিআরের আওতায় সৈয়দপুর পানি উন্নয়ন বিভাগের দুটি আবাসিক কলোনির বিভিন্ন সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজও করা হয়েছে। আবাসিক ভবন মেরামত, বিদ্যুৎ লাইনের খুঁটি পরিবর্তন ও লাইন মেরামত, স্যানিটারি সামগ্রী সরবরাহ, পানি সরবরাহের বৈদ্যুতিক পাম্প ও পাইপ মেরামতসহ বিভিন্ন কাজে অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন অবকাঠামোর সাব-সয়েল টেস্ট, কলোনির মসজিদ মেরামত এবং পানি উন্নয়ন বিভাগের অধিগ্রহণ করা জমির নামজারি বাবদও অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। এসব খাতে মোট ব্যয় হয়েছে ২৪ লাখ ৯৪ হাজার টাকা।
নদীভাঙন রোধে দীর্ঘমেয়াদি সুফলের আশা
পানি উন্নয়ন বোর্ডের এসব উদ্যোগকে উত্তর জনপদের নদীতীরবর্তী মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা। তাঁদের মতে, নদীভাঙন রোধ করা গেলে একদিকে যেমন মানুষের বসতভিটা ও কৃষিজমি রক্ষা পাবে, অন্যদিকে কৃষি উৎপাদনও স্থিতিশীল হবে। এর ফলে স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলের খাদ্যনিরাপত্তায়ও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
সৈয়দপুর পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আখিনুজ্জামান বলেন, এনডিআর বাজেটের আওতায় যেসব কাজ বাস্তবায়ন করা হয়েছে, সেগুলো সরেজমিনে পরিদর্শন ও যথাযথ তদারকির মাধ্যমে সুন্দরভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। কোথাও কাজের সমস্যা দেখা দিলে ঠিকাদারের মাধ্যমে পুনরায় তা সমাধান করা হয়। পাশাপাশি সাইফুন সংস্কারের কারণে অনেকাংশে জলাবদ্ধতা কমে গেছে। এরপরও কোনো ধরনের অনিয়ম চোখে পড়লে ঠিকাদারের জামানত কেটে নিয়ে প্রয়োজনীয় কাজ করা হবে।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, চলমান ও বাস্তবায়িত এসব উদ্যোগের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে উত্তর জনপদের নদীতীরবর্তী লাখো মানুষের দীর্ঘদিনের নদীভাঙন ও বন্যার দুর্ভোগ অনেকটাই কমে আসবে।
ভোরের আকাশ/সু.পা