চাকরি ছেড়ে মাল্টা বাগানে স্বপ্ন বুনছেন কিবরিয়া

ঢাকার ব্যস্ত নগরজীবনের চাকরি ছেড়ে গ্রামের মাটির টানে ফিরে এসেছিলেন গোলাম কিবরিয়া। শখের ছাদবাগান থেকেই শুরু হয়েছিল তার স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন এখন রূপ নিয়েছে বাণিজ্যিক মাল্টা বাগানে।
গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার জামালপুরে মাত্র তিন বিঘা জমিতে মাল্টা চাষ শুরু করে কয়েক বছরের ব্যবধানে বাগান সম্প্রসারণ করেছেন প্রায় সাত বিঘায়। বর্তমানে তার বাগানে রয়েছে প্রায় এক হাজার মাল্টা গাছ।
একসময় ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন গোলাম কিবরিয়া। চাকরির পাশাপাশি শখের বসে বাসার ছাদে বিভিন্ন ধরনের গাছ লাগাতেন তিনি। ছাদবাগানে সাফল্য পাওয়ার পর নিজের গ্রামে ফলের বাগান করার পরিকল্পনা করেন। পরিবারের সঙ্গে পরামর্শ করে শুরু করেন মাল্টা চাষের প্রস্তুতি।
চাষাবাদ শুরুর আগে স্থানীয় কৃষি অফিস এবং ঢাকার খামারবাড়ির কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তিনি। কৃষি বিভাগের পরামর্শ নিয়ে জমি প্রস্তুত, চারা সংগ্রহ ও বাগানের পরিচর্যার পরিকল্পনা করেন। প্রথম ধাপে প্রায় তিন বিঘা জমিতে বারি-১ ও বারি-২ জাতের দুই শতাধিক মাল্টার চারা রোপণ করেন।
বাগান তৈরির শুরুতে জমি প্রস্তুত, চারপাশে বেড়া দেওয়া, চারা কেনা, সার ও পরিচর্যাসহ বিভিন্ন খাতে প্রায় দুই লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন কিবরিয়া। নিজের সঞ্চয়ের পাশাপাশি স্ত্রীর সঞ্চয়ের অর্থও এ কাজে ব্যয় করেন তিনি।
তবে শুরুটা সহজ ছিল না। প্রথম দুই বছর তেমন কোনো আয় হয়নি। প্রথম বছরে গাছে ফল আসেনি। দ্বিতীয় বছরে ফুল এলেও গাছের বয়স কম থাকায় ভালো ফলনের জন্য ফুল ভেঙে দেন তিনি। তৃতীয় বছর থেকে শুরু হয় কাঙ্ক্ষিত ফলন।
তৃতীয় বছরের মাল্টা বিক্রির আয় দিয়ে ওই বছরের বাগানের খরচ মেটাতে সক্ষম হন কিবরিয়া। পরের বছর বিক্রির আয় থেকে উঠে আসে আগের দুই বছরের বিনিয়োগ। এরপর ধীরে ধীরে লাভের মুখ দেখতে শুরু করেন তিনি।
তিন বিঘার সেই বাগান এখন বিস্তৃত হয়েছে প্রায় সাত বিঘা জমিতে। বাগানে রয়েছে প্রায় এক হাজার মাল্টা গাছ। সব গাছে এখনও ফল না এলেও এরই মধ্যে প্রায় দুই শতাধিক গাছে এসেছে ফলন। গাছের ডালে ডালে ঝুলছে থোকায় থোকায় মাল্টা।
নভেম্বরের শেষ থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে এসব মাল্টা বাজারজাত করার পরিকল্পনা রয়েছে কিবরিয়ার। প্রতি গাছ থেকে অন্তত তিন হাজার টাকা করে আয়ের আশা করছেন তিনি। এ হিসাবে চলতি মৌসুমে প্রায় দুই শতাধিক ফলন্ত গাছ থেকে প্রায় ছয় লাখ টাকা আয়ের প্রত্যাশা করছেন এই উদ্যোক্তা।
মাল্টার পাশাপাশি কিবরিয়ার বাগানে রয়েছে ড্রাগন, পেয়ারা, পেঁপে, সফেদা, শরিফা, ভিয়েতনামি খাটো জাতের নারিকেল, ব্ল্যাক আখ ও আদাসহ বিভিন্ন ধরনের ফল ও ফসল। তবে বাগানের মূল আকর্ষণ এখন মাল্টা।
ফলের স্বাদ ও গুণগত মান ধরে রাখতে রাসায়নিক সারের পরিবর্তে জৈব উপাদানের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি। কেঁচো কম্পোস্ট, হাঁসের বিষ্ঠা, কচুরিপানাসহ বিভিন্ন জৈব উপাদান ব্যবহার করছেন বাগানে। এতে উৎপাদন খরচ কমার পাশাপাশি মাটির উর্বরতা ও ফলের গুণগত মান ধরে রাখার চেষ্টা করছেন তিনি।
কিবরিয়ার সফলতা দেখে আশপাশের অনেক কৃষকও মাল্টা চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। কেউ কেউ ইতোমধ্যে বাগান করার পরিকল্পনাও করছেন। উৎপাদনের পাশাপাশি মাল্টা বাজারজাতকরণেও নিজস্ব কৌশল তৈরি করেছেন কিবরিয়া। বাগানে ফল আসার আগেই মাল্টার নমুনা নিয়ে গাইবান্ধা ও আশপাশের বিভিন্ন ফলের আড়তে যোগাযোগ করেন তিনি। অনেক সময় আগাম অর্ডারও নিয়ে রাখেন।
শুরুতে রংপুরে মাল্টা বিক্রি করলেও পরিবহন খরচ বেশি হওয়ায় পরে পীরগঞ্জের বাজারে সরবরাহ শুরু করেন। গত তিন বছর ধরে গাইবান্ধাতেই তার মাল্টার বাজার বাড়ছে। বর্তমানে চাহিদা এতটাই বেশি যে, নিজের বাগানের উৎপাদন দিয়ে ক্রেতাদের মোট চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ পূরণ করতে পারছেন বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. আসাদুজ্জামান বলেন,'স্থানীয়ভাবে মাল্টার উৎপাদন বাড়লে কৃষকদের জন্য নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি দেশে উৎপাদিত ফলের সরবরাহ বাড়ায় বিদেশি ফলের ওপর নির্ভরশীলতাও কমানো সম্ভব হবে।'
গোলাম কিবরিয়ার গল্পটি তাই শুধু একটি মাল্টা বাগানের সাফল্যের গল্প নয়; এটি শখ থেকে উদ্যোক্তা হয়ে ওঠারও গল্প। ঢাকার চাকরি ছেড়ে গ্রামের মাটিতে ফিরে যে স্বপ্ন বুনেছিলেন তিনি, সেই স্বপ্ন এখন ছড়িয়ে পড়েছে সাত বিঘা জমিজুড়ে। গাছে গাছে ঝুলছে সম্ভাবনার ফল, আর সেই ফলনেই নতুন ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছেন কিবরিয়া।
ভোরের আকাশ/ইউএম