পিঙ্ক অক্টোবর: সচেতনতাই হোক স্তন ক্যান্সারের বিরুদ্ধে প্রথম শক্তি

প্রতি বছর অক্টোবর মাস বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ‘ব্রেস্ট ক্যান্সার অ্যাওয়ারনেস মান্থ’ বা স্তন ক্যান্সার সচেতনতা মাস হিসেবে। গোলাপি ফিতা বা ‘পিঙ্ক রিবন’ এ সচেতনতার প্রতীক। তবে পিঙ্ক অক্টোবর কেবল প্রতীকী আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো নারীদের নিজের শরীর সম্পর্কে সচেতন করা, স্তনের অস্বাভাবিক পরিবর্তন দ্রুত শনাক্ত করতে শেখানো ও প্রয়োজন হলে সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে উৎসাহিত করা।
স্তন ক্যান্সারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো সময়। রোগটি যত প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা যায়, চিকিৎসার সুযোগ ও সফলতার সম্ভাবনাও তত বাড়ে। অথচ আমাদের দেশে এখনো অনেক নারী স্তনে চাকা বা অন্য কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করার পরও দীর্ঘদিন চিকিৎসকের কাছে যান না। এর পেছনে ভয়, সংকোচ, সামাজিক কুসংস্কার, সচেতনতার অভাব এবং ক্যান্সার ধরা পড়ার আতঙ্কসহ নানা কারণ রয়েছে।
তবে মনে রাখতে হবে, স্তনে চাকা অনুভূত হলেই সেটি ক্যান্সার—এমন নয়। স্তনের অনেক সমস্যাই নিরীহ বা বিনাইন হতে পারে। কিন্তু কোনো চাকা বা অস্বাভাবিক পরিবর্তনকে অবহেলা করে নিজে নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়াও ঠিক নয়। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে চিকিৎসকই সমস্যার প্রকৃতি নির্ধারণ করতে পারেন।
কোন পরিবর্তনগুলো অবহেলা করবেন না?
স্তনে বা বগলে নতুন কোনো চাকা অনুভূত হওয়া, স্তনের আকার বা আকৃতিতে অস্বাভাবিক পরিবর্তন, স্তনের চামড়ায় টান পড়া বা গর্তের মতো হয়ে যাওয়া, নিপল হঠাৎ ভেতরের দিকে ঢুকে যাওয়া, নিপল দিয়ে রক্ত বা অস্বাভাবিক তরল বের হওয়া কিংবা স্তনের চামড়ায় দীর্ঘস্থায়ী কোনো পরিবর্তন দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
আবার ব্যথা না থাকলে সমস্যা গুরুতর নয়—এমন ধারণাও সঠিক নয়। প্রাথমিক পর্যায়ের স্তন ক্যান্সারে অনেক সময় কোনো ব্যথা থাকে না। তাই শুধু ব্যথাকে সতর্কসংকেত হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
নিজের স্তন সম্পর্কে সচেতন থাকুন
প্রত্যেক নারীর নিজের স্তনের স্বাভাবিক গঠন ও পরিবর্তন সম্পর্কে ধারণা থাকা গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত নিজের স্তনের দিকে খেয়াল রাখলে নতুন কোনো পরিবর্তন সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব। কোনো অস্বাভাবিকতা অনুভব করলে আতঙ্কিত না হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তবে শুধু নিজে স্তন পরীক্ষা করাই স্তন ক্যান্সার শনাক্তের একমাত্র উপায় নয়। বয়স, পারিবারিক ইতিহাস ও ব্যক্তিগত ঝুঁকির ওপর নির্ভর করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা এবং প্রয়োজনমতো ম্যামোগ্রামসহ অন্যান্য পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ভয় নয়, প্রয়োজন সঠিক সিদ্ধান্ত
স্তন ক্যান্সারের চিকিৎসায় বর্তমানে সার্জারি, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, হরমোন থেরাপি ও টার্গেটেড থেরাপিসহ বিভিন্ন চিকিৎসাপদ্ধতি রয়েছে। রোগের ধরন ও পর্যায় অনুযায়ী চিকিৎসার পরিকল্পনাও ভিন্ন হয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, স্তন ক্যান্সারের অস্ত্রোপচার মানেই সব ক্ষেত্রে পুরো স্তন অপসারণ করতে হবে—এমন নয়। উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে ‘ব্রেস্ট-কনজারভিং সার্জারি’ বা স্তন সংরক্ষণ করে ক্যান্সার আক্রান্ত অংশ অপসারণের সুযোগ থাকতে পারে। আবার কিছু রোগীর ক্ষেত্রে মাসটেকটমিই নিরাপদ ও উপযুক্ত চিকিৎসা হতে পারে। তাই অন্য কারও চিকিৎসার সঙ্গে নিজের চিকিৎসার তুলনা না করে রোগের ধরন ও অবস্থার ভিত্তিতে ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসা সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।
পরিবারেরও দায়িত্ব আছে
কোনো নারী স্তনে অস্বাভাবিকতা অনুভব করলে তাঁর প্রথম প্রয়োজন আতঙ্ক নয়, সহযোগিতা। পরিবারের সদস্যদের তাঁর পাশে দাঁড়াতে হবে। ‘কিছু হবে না’ বলে সমস্যাটি এড়িয়ে যাওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি পরীক্ষা-নিরীক্ষার আগেই ‘ক্যান্সার হয়ে গেছে’ বলে ভয় দেখানোও অনুচিত।
বিশেষ করে আমাদের সমাজে অনেক নারী নিজের স্বাস্থ্যের বিষয়টি পরিবারের অন্যান্য প্রয়োজনের পরে রাখেন। সংকোচ বা ব্যস্ততার কারণে চিকিৎসকের কাছে যেতেও দেরি করেন। এই মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। নিজের স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া কোনো বিলাসিতা নয়; এটি একজন নারীর অধিকার এবং তাঁর পরিবার ও সমাজের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
পিঙ্ক অক্টোবরের বার্তা হোক সারা বছর
স্তন ক্যান্সার নিয়ে সচেতনতা শুধু অক্টোবর মাসে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। পিঙ্ক অক্টোবর আমাদের মনে করিয়ে দেয়—নিজের শরীর সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে, অস্বাভাবিক পরিবর্তনকে গুরুত্ব দিতে হবে এবং প্রয়োজন হলে সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
স্তনে পরিবর্তন মানেই ক্যান্সার নয়। আবার ক্যান্সার মানেই সব শেষও নয়। সময়মতো শনাক্তকরণ, সঠিক রোগনির্ণয় ও উপযুক্ত চিকিৎসা একজন রোগীর চিকিৎসাযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে।
ভয় নয়, সচেতনতা ছড়িয়ে পড়ুক। অবহেলা নয়, সময়মতো চিকিৎসা নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে উঠুক।
ডা. সিফাত তানজিলা
কনসালট্যান্ট, জেনারেল, ল্যাপারোস্কোপিক ও ব্রেস্ট সার্জারি
MBBS, FCPS, MCPS (Surgery), MRCS (England), FMAS
ভোরের আকাশ/জেআ