ট্যাপের পানি রান্নায় ব্যবহারের আগে যে বিষয়টি জানা জরুরি

রান্নাঘরের দৈনন্দিন কাজে ট্যাপের পানি ব্যবহার করা আমাদের অনেকেরই স্বাভাবিক অভ্যাস। ভাত রান্না, চাল ধোয়া কিংবা ডাল সেদ্ধ—প্রায় সব ক্ষেত্রেই সরাসরি কলের পানি ব্যবহার করা হয়। পানি দেখতে স্বচ্ছ ও পরিষ্কার হওয়ায় অনেকেই এটিকে নিরাপদ বলেই ধরে নেন। কিন্তু এই পানি রান্নার কাজে ব্যবহারের জন্য কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
এনডিটিভি ফুডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু পানি ফুটিয়ে নিলেই সব ধরনের দূষণ থেকে মুক্ত হওয়া যায়—এমন ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, পানি ফুটিয়ে জীবাণু ধ্বংস করা সম্ভব হলেও এতে থাকা সব ক্ষতিকর রাসায়নিক ও দ্রবীভূত দূষক দূর হয় না।
পানি ফুটালে কি সব দূষণ দূর হয়?
পানি ফুটিয়ে পানযোগ্য করে তোলার ধারণাটি বেশ প্রচলিত। উচ্চ তাপমাত্রায় ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও বিভিন্ন পরজীবী ধ্বংস হতে পারে—এটি সত্য। তবে এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার তথ্য অনুযায়ী, পানি ফুটানোর পরও সীসা, আর্সেনিক, ফ্লোরাইড, নাইট্রেট এবং শিল্পকারখানার কিছু রাসায়নিকের মতো দ্রবীভূত উপাদান পানিতে থেকে যেতে পারে। ইউরেকা ফোর্বসের প্রধান পানি বিজ্ঞানী ড. অনিল কুমারের মতে, শুধু ফুটিয়ে পানিকে সম্পূর্ণ নিরাপদ মনে করা একটি প্রচলিত ভুল ধারণা। তাপ জীবাণু ধ্বংসে কার্যকর হলেও রাসায়নিক দূষক দূর করতে পারে না।
বেশি সময় ফুটালে উল্টো বাড়তে পারে ঝুঁকি
পানি বেশি সময় ধরে ফুটিয়ে রাখলেও সব ক্ষেত্রে উপকার পাওয়া যায় না। বরং কিছু পরিস্থিতিতে এতে ক্ষতিকর উপাদানের ঘনত্ব বেড়ে যেতে পারে। বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, পানি ফুটতে থাকলে এর একটি অংশ বাষ্প হয়ে উড়ে যায়। কিন্তু পানিতে দ্রবীভূত অনেক রাসায়নিক উপাদান পাত্রেই থেকে যায়। ফলে পানির পরিমাণ কমার সঙ্গে সঙ্গে এসব উপাদানের ঘনত্ব তুলনামূলকভাবে বেড়ে যেতে পারে। এ ছাড়া মার্কিন এনভায়রনমেন্টাল প্রোটেকশন এজেন্সি (ইপিএ) জানিয়েছে, গরম পানি ঠান্ডা পানির তুলনায় পাইপ বা কলের সংস্পর্শে থাকা সীসা দ্রুত দ্রবীভূত করতে পারে। ফলে কিছু ক্ষেত্রে গরম পানিতে সীসার উপস্থিতির ঝুঁকি বাড়তে পারে।
মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়েও উদ্বেগ
পানির মান নিয়ে আলোচনায় এখন মাইক্রোপ্লাস্টিকও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। অতি ক্ষুদ্র এসব প্লাস্টিক কণা খালি চোখে দেখা যায় না এবং সাধারণত এগুলোর স্বাদ বা গন্ধও থাকে না। বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘমেয়াদে মাইক্রোপ্লাস্টিকের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। ফলে পানির দৃশ্যমান স্বচ্ছতাকেই নিরাপত্তার একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা না করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
রান্নার পানিতে দীর্ঘমেয়াদি অভ্যাসই মূল বিষয়
রান্নায় ট্যাপের পানি ব্যবহার করলেই তাৎক্ষণিকভাবে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়বেন—বিষয়টি এমন নয়। বরং উদ্বেগের জায়গাটি হলো দীর্ঘদিনের অভ্যাস। প্রতিদিন খাবার ও রান্নার মাধ্যমে অল্প পরিমাণে বিভিন্ন দূষক শরীরে প্রবেশ করলে দীর্ঘমেয়াদে তার প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। ড. অনিল কুমারের মতে, রান্নার পানিকে শুধু খাবার তৈরির একটি উপাদান হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি শেষ পর্যন্ত শরীরের ভেতরেই প্রবেশ করে। তাই পানির মানের বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, পান করার পানির মতো রান্নায় ব্যবহৃত পানির মানের দিকেও নজর দেওয়া উচিত। এলাকার পানির উৎস, পাইপলাইনের অবস্থা এবং পানিতে দূষণের সম্ভাবনা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া জরুরি। প্রয়োজনে উপযুক্ত পানি পরিশোধন ব্যবস্থা ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে কোন ধরনের ফিল্টার প্রয়োজন, তা পানিতে থাকা দূষকের ধরন ও স্থানীয় পানির মানের ওপর নির্ভর করে। অর্থাৎ, শুধু পানি ফুটিয়ে নিলেই সব ধরনের দূষণ দূর হবে—এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে রান্নার পানির নিরাপত্তাকেও গুরুত্ব দেওয়ার সময় এসেছে। তথ্যসূত্র: এনডিটিভি ফুড
ভোরের আকাশ/সু.পা