কঙ্গোতে ইবোলায় রেকর্ড মৃত্যু, প্রাণ গেল ২ হাজার ৩২৫ জনের

ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে (ডিআর কঙ্গো) ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে ইবোলা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব। দেশটির সরকারি সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ভাইরাসটিতে ২ হাজার ৩২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ২০১৮ থেকে ২০২০ সালের প্রাদুর্ভাবের মৃত্যুর সংখ্যাকে ছাড়িয়ে এবারের সংক্রমণ দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী ইবোলা প্রাদুর্ভাবে পরিণত হয়েছে।
রোববার (১৬ আগস্ট) প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে ডিআর কঙ্গোর জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, দেশটিতে নিশ্চিত ইবোলা আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে ৪ হাজার ৯৪৫ জনে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১০১ জনের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে।
জাতিসংঘের মানবিকবিষয়ক প্রধান টম ফ্লেচার শুক্রবার এক বিবৃতিতে সতর্ক করে বলেছেন, এটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া ইবোলা প্রাদুর্ভাব। পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার আগেই দ্রুত ও ব্যাপক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এ জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত সহযোগিতার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
এটি ডিআর কঙ্গোয় ইবোলার ১৭তম প্রাদুর্ভাব। আক্রান্তের সংখ্যার দিক থেকেও এটি ইতোমধ্যে দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রাদুর্ভাব হয়ে উঠেছে। জুলাইয়ের শেষ দিকে আক্রান্তের সংখ্যা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। এবারের প্রাদুর্ভাবে মৃতের সংখ্যা এখন ২ হাজার ৩২৫ জন, যেখানে ২০১৮-২০২০ সালের প্রাদুর্ভাবে প্রাণ হারিয়েছিলেন ২ হাজার ২৯৯ জন।
টম ফ্লেচার বলেন, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে ইবোলার সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে। ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে প্রতিরোধব্যবস্থাকে আরও দ্রুত ও কার্যকর করতে হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রেয়েসুসও বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক করেছেন। সংক্রমণের বর্তমান গতি অব্যাহত থাকলে এবারের প্রাদুর্ভাব ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালের পশ্চিম আফ্রিকার ভয়াবহ ইবোলা মহামারির কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ওই মহামারিতে গিনি, লাইবেরিয়া ও সিয়েরা লিওনে ২৮ হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত এবং ১১ হাজারের বেশি মানুষ মারা গিয়েছিলেন।
বর্তমান প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ী ইবোলা ভাইরাসের বান্দিবুগিও প্রজাতি। এই প্রজাতির বিরুদ্ধে এখনো কোনো অনুমোদিত টিকা বা চিকিৎসা নেই। গত ১৫ মে প্রাদুর্ভাব ঘোষণা করার পর থেকেই পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। দুর্বল স্বাস্থ্য অবকাঠামো, দুর্গম এলাকা, স্বাস্থ্যকর্মীদের সীমিত সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক সংঘাত ভাইরাস নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টাকে কঠিন করে তুলছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্তদের মৃত্যুহারও উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। জুনের শুরুতে এই হার ছিল প্রায় ২০ শতাংশ। বর্তমানে তা প্রায় ৪৬ শতাংশে পৌঁছেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর অন্যতম কারণ হলো অনেক রোগীকে দেরিতে শনাক্ত করা হচ্ছে এবং চিকিৎসা শুরু হচ্ছে সংক্রমণের অনেক পর।
ডিআর কঙ্গোয় কাজ করা আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সংস্থা ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্সের (এমএসএফ) জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ থমাস পারিশ বলেন, সাধারণত কোনো প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ এবং রোগীদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনা হলে মৃত্যুহার কমে আসার কথা।
তবে এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেক রোগীকে খুব দেরিতে শনাক্ত করা হচ্ছে। ফলে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনাও কমে যাচ্ছে। এমনকি অনেক রোগী কমিউনিটিতেই মারা যাওয়ার পর তাদের শনাক্ত করা হচ্ছে।
বর্তমানে বান্দিবুগিও প্রজাতির বিরুদ্ধে কয়েকটি পরীক্ষামূলক টিকা ও চিকিৎসাপদ্ধতি নিয়ে গবেষণা চলছে। একই সঙ্গে বিদ্যমান ইবোলা চিকিৎসাগুলো এই প্রজাতির বিরুদ্ধে কার্যকর কি না, তা যাচাই করছেন বৈশ্বিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তবে এসব চিকিৎসার কার্যকারিতা নিয়ে এখন পর্যন্ত প্রমাণ সীমিত।
ভোরের আকাশ/সু.পা