বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন
বিশ্বে এখনও ৬৫৫ মিলিয়ন মানুষ বিদ্যুৎবিহীন

# পরিচ্ছন্ন রান্নার সুবিধা নেই ২০০ কোটির, এসডিজি-৭ অর্জনে অগ্রগতি ধীর
# জ্বালানির সার্বজনীন প্রাপ্তি কেবল জ্বালানি সংকট নয়; একটি মৌলিক স্বাস্থ্যগত আবশ্যকতা- ড. টেড্রোস আধানম গেব্রেয়াসুস
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য ও আধুনিক জ্বালানি সুবিধা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রæতি থাকলেও বিশ্ব এখনও সেই লক্ষ্য থেকে অনেক দূরে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ৬৫৫ মিলিয়ন মানুষ এখনও বিদ্যুৎ সুবিধার বাইরে রয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় ২০০ কোটি মানুষ রান্নার জন্য দূষণকারী জ্বালানি ও প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল, যা তাদের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে।
বুধবার প্রকাশিত ‘ট্র্যাকিং এসডিজি-৭: দ্য এনার্জি প্রোগ্রেস রিপোর্ট’-এ এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনটি যৌথভাবে বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ), আন্তর্জাতিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংস্থা (আইরেনা), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডবিøউএইচও) এবং জাতিসংঘের পরিসংখ্যান বিভাগ প্রস্তুত করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ঘাটতির সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করছে সাব-সাহারান আফ্রিকা। এ অঞ্চলে ৫৬০ মিলিয়নের বেশি মানুষ এখনও বিদ্যুৎবিহীন জীবনযাপন করছে এবং ৯৭০ মিলিয়ন মানুষের পরিচ্ছন্ন রান্নার সুবিধা নেই।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বৈশ্বিক বিদ্যুৎ সুবিধা প্রাপ্তির হার ৯২ শতাংশে স্থির হয়ে যায়। গত এক দশকের তুলনায় বিদ্যুতায়নের বার্ষিক অগ্রগতি অর্ধেকে নেমে এসেছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। ২০১০ সালে যেখানে বিদ্যুৎবিহীন গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ছিল ৩৭ কোটি ৬০ লাখ, ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৪ কোটি ৭০ লাখে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান গতিতে এগোলে ২০৩০ সালের মধ্যে সার্বজনীন বিদ্যুৎ সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। এ লক্ষ্য অর্জনে বিদ্যুতায়নের গতি বর্তমানের তুলনায় তিনগুণ বাড়াতে হবে।
পরিচ্ছন্ন রান্নার জ্বালানির ক্ষেত্রেও অগ্রগতি অত্যন্ত অসম। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষ এখনও কাঠ, কয়লা ও অন্যান্য দূষণকারী জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। শহর ও গ্রামের মধ্যে বৈষম্যও স্পষ্ট। শহরাঞ্চলের ৮৯ শতাংশ মানুষ পরিচ্ছন্ন রান্নার সুবিধা পেলেও গ্রামীণ এলাকায় এই হার মাত্র ৫৬ শতাংশ। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালেও প্রায় ১৮০ কোটি মানুষ দূষণকারী জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল থাকবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তবে প্রতিবেদনটি কিছু ইতিবাচক অগ্রগতির কথাও তুলে ধরেছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের সম্প্রসারণ অব্যাহত রয়েছে এবং বর্তমানে বৈশ্বিক বিদ্যুৎ ব্যবহারের ৩০ শতাংশের বেশি নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসছে। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা মাথাপিছু ৫৪৪ ওয়াটে পৌঁছে নতুন রেকর্ড গড়েছে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোতে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতে আন্তর্জাতিক সরকারি অর্থায়নও কিছুটা বেড়ে ২৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তবে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য বরাদ্দ কমে যাওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে। ২০২৪ সালে এসব দেশে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১১ শতাংশ কম।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ সংযোগ সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে অবকাঠামোর পাশাপাশি সাশ্রয়যোগ্যতাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক পরিবার বিদ্যুৎ সংযোগ ফি, ঘরোয়া ওয়্যারিং বা নিয়মিত বিদ্যুৎ বিল বহন করতে পারে না। ফলে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি, উদ্ভাবনী অর্থায়ন ব্যবস্থা এবং স্বল্প ব্যয়ের বিদ্যুতায়ন উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি।
প্রতিবেদনটি সতর্ক করে বলেছে, জরুরি ও সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে বিশ্ব ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি-৭ অর্জনে ব্যর্থ হবে। এজন্য রাজনৈতিক অঙ্গীকার জোরদার করা, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক ড. টেড্রোস আধানম গেব্রেয়াসুস বলেন, পরিচ্ছন্ন ও টেকসই জ্বালানির সার্বজনীন প্রাপ্তি কেবল একটি জ্বালানি সংকট নয়; এটি একটি মৌলিক স্বাস্থ্যগত আবশ্যকতা। রান্নার জ্বালানি থেকে সৃষ্ট গৃহস্থালির বায়ু দূষণ লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন কেড়ে নেয়, দীর্ঘমেয়াদী রোগ ও অক্ষমতার কারণ হয় এবং আমাদের পরিবেশের ক্ষতি করে। এটি বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠী এবং নারীদের ওপর অসমভাবে বোঝা চাপায়, যারা জ্বালানি সংগ্রহের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করে, যা সবচেয়ে দুর্বলদের জন্য বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে তোলে। জ্বালানি সুরক্ষার এই অভূতপূর্ব সংকটের মধ্যে, স্বাস্থ্য ও লিঙ্গ সমতার উন্নতি, জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমন এবং পরিবার ও সরকারের খরচ কমানোর জন্য পরিচ্ছন্ন রান্নার দিকে পরিবর্তন অপরিহার্য।
ভোরের আকাশ/এনএস