অন্তহীন অনিয়মে নিমজ্জিত শিশু হাসপাতাল

অন্তহীন অনিয়মে নিমজ্জিত বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে নানা অনিয়ম দেখেছেন, এমনকি প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শনকালে নিজ কক্ষে ধূমপানরত অবস্থায় এক চিকিৎসককে দেখতে পান। প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে শিশু হাসপাতালের অভ্যন্তরে একজন শিশু চিকিৎসকের ধূমপানের ঘটনা নিঃসন্দেহে প্রতিষ্ঠানের বাস্তবচিত্র উপস্থাপন করে।
এদিকে, প্রতিষ্ঠানটিতে চিকিৎসক নিয়োগ ও পদোন্নতি, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, প্রশাসনিক ক্ষমতার ব্যবহার এবং রোগী অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরের বিনিময়ে কমিশন নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. কে. এম. আজিজুল হক এবং কয়েকজন কর্মকর্তা ও চিকিৎসকের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ তুলে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর কাছে তদন্তের আবেদন করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, নিয়োগ ও পদোন্নতিতে বিধিবহির্ভূত সিদ্ধান্ত, অবসরপ্রাপ্ত চিকিৎসককে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, প্রশাসনিক পদে নিয়োগের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন এবং হাসপাতালের রোগীদের অন্য প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে কমিশন নেওয়ার মতো কর্মকাণ্ডের কারণে হাসপাতালের সামগ্রিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একটি প্রভাবশালী চক্রের কারণে কর্মকর্তা-কর্মচারী ও চিকিৎসকদের একাংশের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি একজন সংবাদকর্মী শিশু হাসপাতালের দালাল চক্রের বিষয়ে প্রতিবেদন করতে গেলে তাকে সেখান থেকে বের করে দেওয়া হয় এবং নানা ধরনের হুমকি দেওয়া হয়।
নিয়োগ ও পদোন্নতি
২০২৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালনা বোর্ড গঠন করা হয়। এরপর থেকে বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. কে. এম. আজিজুল হকের উদ্যোগে বিভিন্ন নিয়োগ ও পদোন্নতির সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ইনস্টিটিউট আইন-২০২১ এর ৬(১) ধারার (ক) দফায় স্পষ্টত সরকার মনোনীত জাতীয়ভাবে সুনাম অর্জনকারী চিকিৎসা বিষয়ে জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক বোর্ডের সভাপতি হওয়ার কথা উল্লেখ আছে। আগেও এই বোর্ডের সভাপতি হিসেবে জাতীয় অধ্যাপক শাহলা খাতুন, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিশুবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শহিদুল্লাহ দায়িত্ব পালন করেছেন।
১৮ মে ২০২৫ তারিখে কয়েকজন চিকিৎসককে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। তাদের যোগ্যতা ও ডিগ্রির ভিত্তিতে পদোন্নতির বৈধতা নিয়েও আপত্তি ওঠে। এদের মধ্যে একজন নারী চিকিৎসক ২০১১ সালে মেডিকেল অফিসার থাকাকালে চাকরি ছেড়ে চলে যান। বর্তমানে তাকে অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী সময়ে ২০২৬ সালের আগস্টে কয়েকজনের সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক পদে পদোন্নতি নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়েছে। কোনো স্নাতকোত্তর ডিগ্রি ছাড়াই আরেকজন চিকিৎসককে অধ্যাপক এবং বোর্ডের সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া ১০ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে ৫০ জন চিকিৎসক এবং আয়া, ওয়ার্ডবয় ও পিওনসহ আরও ৫০ জন কর্মী নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে চাকরিপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে আর্থিক লেনদেনের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া সহকারী পরিচালক (উন্নয়ন) পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে বয়সসীমা লঙ্ঘন করে প্রায় ৫০ বছর বয়সী একজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে ২০ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে।
অবসরপ্রাপ্ত চিকিৎসকের নিয়োগ
হাসপাতালের সাবেক কনসালট্যান্ট ডা. মো. আজহারুল ইসলামকে উপপরিচালক (হাসপাতাল) পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। শিশু হাসপাতালের নীতিমালা অনুযায়ী যা গ্রহণযোগ্য নয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ২০২৫ সালের ১১ এপ্রিল অনুষ্ঠিত পরিচালনা বোর্ডের ২২তম সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাকে মাসিক ৭৫ হাজার টাকা বেতনে নিয়োগ দেওয়া হয়। হাসপাতাল প্রশাসনে কর্মরতরা বলছেন, প্রতিষ্ঠানের প্রচলিত সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী কর্মরত জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকদের মধ্য থেকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে এ পদ পরিচালনার ব্যবস্থা রয়েছে।
রোগী অন্য হাসপাতালে
হাসপাতালের কিছু কর্মচারী ও চিকিৎসকের যোগসাজশে রোগীদের অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরের বিনিময়ে কমিশন রুটিন কাজে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ২৫ জন রোগীকে অন্য হাসপাতালে পাঠানো হয় এবং প্রতিটি রোগীর বিপরীতে নির্দিষ্ট পরিমাণে কমিশন নেওয়া হয়। এতে কয়েকজন ওয়ার্ড মাস্টার, প্রশাসনিক কর্মচারী ও চিকিৎসকের সম্পৃক্ততার কারণে হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা রোগী ভাগানোয় কোমর বেঁধে নেমেছে। হাসপাতালে শয্যা খালি নেই অজুহাতে শিশু রোগীদের বাবা-মায়েদের বারান্দা থেকেই অন্যত্র পাঠিয়ে দেয় চক্রটি। শিশু হাসপাতালের শয্যাসংকট কিংবা উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজনের কথা বলে রোগীদের স্থানান্তর করা হলেও কিছু ক্ষেত্রে রোগীরা যথাযথ চিকিৎসাসুবিধা পাবেন কি না, সেটা নিয়ে শঙ্কিত সংশ্লিষ্টরা।
চেয়ারম্যানের কক্ষ ও গাড়ি
পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যানের জন্য হাসপাতালের প্রশাসনিক ভবনের ১৩২(এ) নম্বর কক্ষ বরাদ্দ করা হয়েছে। ওই কক্ষের আসবাব কেনা, কর্মচারী নিয়োজিত রাখা এবং সেখানে নিয়মিত আপ্যায়নের ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এ ছাড়া হাসপাতালের নামে বরাদ্দ করা একটি গাড়ি চেয়ারম্যান ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করেন এবং গাড়ির জ্বালানি ও চালকের ব্যয় প্রতিষ্ঠান বহন করে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। হাসপাতালের অর্থে এসব ব্যয় করা হয়ে থাকলে তার অনুমোদন, আর্থিক বিধি এবং ব্যবহারসংক্রান্ত রেকর্ড যাচাই করা প্রয়োজন। হাসপাতালের আবাসিক কোয়ার্টারে চিকিৎসক ও কর্মচারীদের পরিবারের বসবাসের পরিবেশের মধ্যে একটি রাজনৈতিক সংগঠনের কার্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। এ বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অনুমোদন এবং আবাসিক স্থাপনা ব্যবহারের বিধি যাচাই করা প্রয়োজন।
আর্থিক সংকটে অতিরিক্ত নিয়োগ
জানা গেছে, হাসপাতালের প্রায় ৯৫০ চিকিৎসক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বার্ষিক বেতন-ভাতার প্রয়োজন প্রায় ৬৬ কোটি টাকা। এর বিপরীতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে বছরে প্রায় ৩০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয় বলে দাবি করা হয়েছে। ফলে ঘাটতি মেটাতে প্রতিষ্ঠানটিকে অভ্যন্তরীণ আয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়। বেতন-ভাতা পরিশোধে সংকট এবং সিটি স্ক্যান ও এমআরআইয়ের মতো প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাবের মধ্যে নতুন নিয়োগ ও চুক্তিভিত্তিক পদ সৃষ্টির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
তদন্তের দাবি
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট আইন, ২০২১-এর ৬(১) ধারায় পরিচালনা বোর্ডের গঠন ও সদস্যদের বিষয়ে বিধান রয়েছে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। বোর্ডের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের যোগ্যতা, মনোনয়ন এবং নিয়োগ-পদোন্নতির সিদ্ধান্তের বৈধতা যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট আইন, প্রজ্ঞাপন ও বোর্ড সভার কার্যবিবরণী পরীক্ষা করা প্রয়োজন। শিশুদের চিকিৎসাসেবায় দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ, পদোন্নতি, আর্থিক ব্যবস্থাপনা কিংবা রোগী স্থানান্তরকে কেন্দ্র করে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তার দায় নির্ধারণ জরুরি। একই সঙ্গে অভিযোগের আড়ালে কোনো বৈধ চিকিৎসা সিদ্ধান্ত বা নিয়মসম্মত প্রশাসনিক পদক্ষেপ যেন প্রশ্নবিদ্ধ না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
এসব বিষয়ে অধ্যাপক ডা. কে. এম. আজিজুল হক বলেন, প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শকালের অনাকাক্সিক্ষত ঘটনায় জড়িত চিকিৎসককে সাসপেন্ড করা হয়েছে, ওই দিনই, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার সাথে সাথেই।
নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়েমের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পরীক্ষায় প্রথমে স্ক্রুটিনি হবে এখন। তারপরে যারা হবে তাদের এমসিকিউ পরীক্ষা হবে, ওএমআর সিটে খাতা দেখা হবে, তারপরে লিখিত পরীক্ষায় যারা উত্তীর্ণ হবে তাদের ভাইবা হবে। ডেহেতু নিয়োগ এখন হয়নি তাই লেনদেনের প্রশ্নই আসে না। কোন শুয়োরের বাচ্চা বলে এগুলি! এসব যারা বলেন তাদের ধরে নিয়ে আসবেন আমাদের সামনে। অবশ্যই তারা... মাদার... .. তারা বাংলাদেশের কোনো সময় ভালো চায় না।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান শিশু হাসপাতাল আগের শিশু হাসপাতাল নাই। শিশু হাসপাতালে আমি চেয়ারম্যান হওয়ার পরে কোনো নিয়োগের ব্যাপারে এক পাই-পয়সারও এখানে ট্রানজেকশন হয় নাই।
ভোরের আকাশ/এসএইচ