আদ-দ্বীন হাসপাতালে ৬ শিশুর মৃত্যু : ‘ডাকাডাকি করেও চিকিৎসক-নার্স পাইনি’

ছবি: সংগৃহীত
ঢাকার বেসরকারি আদ-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর রাতে ডাকাডাকি করেও চিকিৎসক বা নার্সদের পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ করেছেন যমজ সন্তান হারানো এক বাবা। তার দাবি, দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক ও নার্সরা সঠিক সময়ে উপস্থিত না থাকায় শিশুদের মৃত্যু হয়েছে।
কোরবানির ঈদের আগের দিন বুধবার ভোরে আদ-দ্বীন হাসপাতালের পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে থাকা ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় দেশজুড়ে গভীর উদ্বেগ, শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
ঘটনার পর রমনা থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ ইতোমধ্যে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কয়েকজন কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অভ্যন্তরীণ তদন্ত সম্পন্ন করলেও এখনো প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি। তারা জানিয়েছে, তদন্ত প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দেওয়া হবে।
মারা যাওয়া ছয় নবজাতকের মধ্যে ছিলেন বরিশালের বাউফল উপজেলার বাসিন্দা মোহাম্মদ হাসান সরদারের যমজ দুই সন্তান।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “আমার স্ত্রীর সিজারের পর যমজ দুই ছেলেই সুস্থ ছিল। মঙ্গলবার রাতে তাদের দেখে ‘বাবা’ বলে ডাকলাম, তারা চোখ মিটমিট করছিল। বুধবার সকালে রিলিজ দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু রিলিজের বদলে ডেথ সার্টিফিকেট দেওয়া হয়েছে।”
হাসান জানান, পরিবারের অনেক সদস্য আগে আদ-দ্বীন হাসপাতালে সন্তান প্রসব করিয়েছেন। সেই আস্থার জায়গা থেকেই তিনি স্ত্রীকে ঢাকায় এনে ভর্তি করেছিলেন।
তিনি বলেন, “যখন জানতে পারি যমজ সন্তান হবে, তখন থেকেই ভালো একটি হাসপাতালে ডেলিভারির কথা ভাবছিলাম। কিন্তু এখানে এসে উল্টো ঘটনা ঘটেছে।”
তার ভাষ্য অনুযায়ী, নবজাতকদের রাখা ওয়ার্ডে পুরুষদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। তাই তিনি নিজে সন্তানদের দেখতে যেতে পারেননি। পরিবারের এক নারী সদস্য কয়েকবার শিশুদের দেখে এসেছিলেন।
হাসান বলেন, “মঙ্গলবার রাতেও বাচ্চাদের দেখানো হয়েছিল। তখন তারা ভালো ছিল। কিন্তু রাত ২টার দিকে ওই কক্ষে অতিরিক্ত গরম ও অস্বাভাবিক গন্ধের বিষয়টি টের পান আমার বোনসহ কয়েকজন স্বজন। তারা চিকিৎসক ও নার্সদের ডাকতে বলেন। কিন্তু কেউ নাকি উপস্থিত ছিলেন না।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, “ঝাড়ুদারদের মাধ্যমেও কয়েকবার খবর পাঠানো হয়েছিল, তবুও কোনো নার্স আসেননি বলে জানতে পেরেছি।”
ঘটনার পরের মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি বলেন, “সকালে ঘুম থেকে ওঠার আগেই হাসপাতাল থেকে ফোন আসে। দ্রুত আসতে বলা হয়। হাসপাতালে গিয়ে জানতে পারি আমার দুই সন্তানই মারা গেছে। তখন কী করব, কিছুই বুঝে উঠতে পারিনি।”
তার অভিযোগ, “ডাক্তার ও নার্সরা সঠিক সময়ে দায়িত্ব পালন করলে হয়তো এই বাচ্চাগুলোর মৃত্যু হতো না।”
হাসান আরও বলেন, সন্তানদের মৃত্যুর পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দ্রুত মরদেহ নিয়ে যেতে বলেছিল। তার স্ত্রীর শারীরিক অবস্থা বা পরবর্তী চিকিৎসা সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, “আমার স্ত্রীর পেটে সেলাই, কিন্তু তার চিকিৎসা নিয়ে কোনো পরিষ্কার তথ্য দেওয়া হয়নি। কোনো কাগজপত্রও বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। একরকম তাড়াহুড়া করেই হাসপাতাল থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে।”
সন্তান হারানোর বেদনার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, “বাসার সবাই অন্য ছেলেদের নামের সঙ্গে মিল রেখে যমজদের নাম রাখার কথা ভাবছিল। আমার আরও তিন ছেলে আছে। তাদের নামের সঙ্গে মিলিয়েই নাম রাখার কথা ছিল। কিন্তু নাম রাখার আগেই তারা চলে গেল।”
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং তদন্ত প্রতিবেদনের ফলাফলের জন্য এখনো অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
ভোরের আকাশ/সু.পা



