বন্যার সময় জীবন বাঁচাতে এড়িয়ে চলুন ঝুঁকিপূর্ণ কিছু কাজ

ছবি: সংগৃহীত
টানা বর্ষণ, উজানের ঢল কিংবা আকস্মিক বন্যা যেকোনো সময় স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে। তবে অনেক ক্ষেত্রে বন্যার চেয়েও মানুষের অসতর্কতা বড় দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া, পানিবাহিত রোগ, সাপের কামড় কিংবা বিভিন্ন দুর্ঘটনায় প্রতিবছর বহু মানুষ আহত হন এবং প্রাণ হারান।
তাই বন্যার সময় কিছু সাধারণ ভুল এড়িয়ে চলা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থাগুলোর পরামর্শ অনুযায়ী, বন্যার পানিতে নিরাপদ থাকতে নিচের বিষয়গুলো অবশ্যই মেনে চলা প্রয়োজন।
অপ্রয়োজনে বন্যার পানিতে নামবেন না
বন্যার পানি অনেক সময় শান্ত মনে হলেও এর নিচে লুকিয়ে থাকতে পারে খোলা ম্যানহোল, গর্ত, ভাঙা রাস্তা, ধারালো বস্তু কিংবা বৈদ্যুতিক তার। তাই প্রয়োজন ছাড়া পানিতে নামা ঝুঁকিপূর্ণ। যদি পানিতে নামতেই হয়, তাহলে লাঠি দিয়ে সামনে পরীক্ষা করে ধীরে ধীরে এগোন এবং সম্ভব হলে শক্ত জুতা বা বুট ব্যবহার করুন।
পানিতে দাঁড়িয়ে বৈদ্যুতিক সুইচ বা যন্ত্র স্পর্শ করবেন না
বন্যার সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়। পানিতে দাঁড়িয়ে কখনো বৈদ্যুতিক সুইচ অন বা অফ করবেন না। ভেজা হাতে কোনো বৈদ্যুতিক যন্ত্র স্পর্শ করাও বিপজ্জনক। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বন্যাকবলিত ঘরে প্রবেশ করা থেকে বিরত থাকুন।
বন্যার পানি পান বা রান্নার কাজে ব্যবহার করবেন না
বন্যার পানিতে নর্দমার বর্জ্য, ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, রাসায়নিক পদার্থ ও ক্ষতিকর জীবাণু মিশে থাকতে পারে। তাই শুধু ফুটানো, বিশুদ্ধ বা বোতলজাত পানি পান করুন। প্রয়োজনে পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ব্যবহার করা যেতে পারে।
খালি পায়ে পানিতে হাঁটবেন না
বন্যার পানিতে খালি পায়ে চলাচল করলে পায়ে কাটা, সংক্রমণ এবং সাপ বা বিষাক্ত প্রাণীর আক্রমণের ঝুঁকি থাকে। নিরাপদ থাকতে রাবারের বুট বা শক্ত স্যান্ডেল ব্যবহার করা ভালো।
বন্যার পানিতে ভেজা খাবার খাবেন না
বন্যার পানির সংস্পর্শে আসা খাবার খেলে ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েডসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগ হতে পারে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে ফ্রিজে সংরক্ষিত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাযুক্ত খাবারও খাওয়া থেকে বিরত থাকুন।
শিশুদের একা পানির কাছে যেতে দেবেন না
বন্যার সময় শিশুরা পানিতে খেলতে আগ্রহী হয়। কিন্তু অল্প গভীর পানিতেও দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই শিশুদের সবসময় বড়দের নজরদারিতে রাখুন এবং বন্যার পানিতে খেলতে নিরুৎসাহিত করুন।
সাপ বা অচেনা প্রাণী ধরার চেষ্টা করবেন না
বন্যার সময় সাপ, গুইসাপসহ বিভিন্ন প্রাণী আশ্রয়ের সন্ধানে মানুষের বসতবাড়িতে চলে আসতে পারে। সাপ বা অচেনা কোনো প্রাণী দেখলে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন। নিজে ধরার চেষ্টা না করে স্থানীয় উদ্ধারকর্মী বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহায়তা নিন।
বন্যার পানিতে যানবাহন চালানোর ঝুঁকি নেবেন না
অনেক সময় পানির গভীরতা বাইরে থেকে বোঝা যায় না। এতে গাড়ি বা মোটরসাইকেল আটকে যেতে পারে কিংবা স্রোতে ভেসে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। রাস্তার অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত না হলে বন্যার পানির মধ্যে দিয়ে যানবাহন চালানো উচিত নয়।
প্রশাসনের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করবেন না
অনেকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বাড়ি ছাড়তে চান না। এতে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। স্থানীয় প্রশাসন, আবহাওয়া অধিদপ্তর ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়া জরুরি।
পানি নেমে গেলেই ঘরে প্রবেশ করবেন না
বন্যার পানি কমে গেলেও বিপদ পুরোপুরি শেষ হয় না। ভেজা বৈদ্যুতিক সংযোগ, দুর্বল দেয়াল, গ্যাস লিক কিংবা বিষাক্ত প্রাণীর উপস্থিতি থাকতে পারে। তাই ঘরে প্রবেশের আগে নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন। প্রয়োজন হলে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ পরীক্ষা করিয়ে নিন।
সচেতনতাই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা
বন্যা পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব না হলেও সতর্কতা ও সঠিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এর ক্ষতি অনেকটাই কমানো যায়। সরকারি নির্দেশনা মেনে চলা, নিরাপত্তার বিষয়গুলো সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং পরিবারের সদস্যদের সতর্ক রাখার মাধ্যমে বড় দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব। মনে রাখবেন, বন্যার সময় সাহস দেখানোর চেয়ে সচেতন থাকা বেশি জরুরি। কারণ একটি ছোট ভুলও বড় বিপদের কারণ হতে পারে।
তথ্যসূত্র: সিডিসি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বাংলাদেশ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর



