দেরিতে চিকিৎসায় জটিল হচ্ছে স্তন ক্যানসার, বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকি : বিআরএফ গবেষণা

ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত নারীদের চিকিৎসা শুরুতে উদ্বেগজনক বিলম্বের তথ্য উঠে এসেছে বায়োমেডিকেল রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (বিআরএফ) এক গবেষণায়। গবেষণায় দেখা গেছে, রোগের উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর অর্ধেকেরও বেশি রোগীর চূড়ান্ত চিকিৎসা শুরু হতে চার মাসের বেশি সময় লেগে যাচ্ছে। ফলে রোগ জটিল পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে, বাড়ছে চিকিৎসা ব্যয় এবং মৃত্যুঝুঁকি।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক একটি গবেষণা সাময়িকীতে প্রকাশিত এই গবেষণায় দেখা যায়, স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত ৫৬ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর থেকে চিকিৎসা শুরু হতে চার মাসেরও বেশি সময় লেগেছে।
গবেষণাটি ঢাকার জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ৩৫৫ জন স্তন ক্যানসার রোগীর ওপর পরিচালিত হয়। গবেষণায় নেতৃত্ব দেন বিআরএফের বিজ্ঞানী ও ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সরোয়ার হোসেন। গবেষণা দলে আরও ছিলেন মোহাম্মদ নাঈম হাসান, সুমাইয়া খান তৃষা এবং ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ড. মো. ওয়াহিদ আখতার।
গবেষণায় দেখা গেছে, ৪১ শতাংশ রোগী উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর তিন মাসের বেশি সময় চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে দেরি করেছেন। অন্যদিকে ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে হাসপাতালের সেবা, রোগ নির্ণয় প্রক্রিয়া কিংবা স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে চিকিৎসা শুরু বিলম্বিত হয়েছে।
প্রথমবার চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার সময় ৪৮ দশমিক ৮ শতাংশ রোগী ক্যানসারের দ্বিতীয় ধাপে এবং ৪৪ দশমিক ১ শতাংশ রোগী তৃতীয় ধাপে ছিলেন। তৃতীয় ধাপের রোগীদের মধ্যে চিকিৎসা বিলম্বের হার সবচেয়ে বেশি, যা ৫১ দশমিক ৫ শতাংশ। গবেষকদের মতে, সময়মতো চিকিৎসা শুরু না হওয়ায় অনেক রোগীর ক্যানসার এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায়, যেখানে চিকিৎসা আরও জটিল, ব্যয়বহুল ও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
গবেষণায় চিকিৎসা বিলম্বের পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণও চিহ্নিত হয়েছে। ৭৯ শতাংশ নারী জানিয়েছেন, প্রথমে তারা ভেবেছিলেন স্তনের সমস্যাটি এমনিতেই সেরে যাবে। ৭৬ শতাংশ অবহেলার কারণে চিকিৎসা নিতে দেরি করেছেন। ৬৬ শতাংশ অর্থনৈতিক সংকটের কারণে চিকিৎসা পিছিয়ে দিয়েছেন। এছাড়া ৪৪ দশমিক ৬ শতাংশ নারী স্তন পরীক্ষা করাতে বা এ বিষয়ে কথা বলতে সংকোচ বোধ করেছেন। ৩৮ শতাংশ জানিয়েছেন, ক্যানসার ধরা পড়ার আশঙ্কা কিংবা কেমোথেরাপির মতো চিকিৎসা নিতে হবে—এমন ভয় তাদের চিকিৎসকের কাছে যেতে দেরি করিয়েছে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, শিক্ষা, পারিবারিক আয় এবং বসবাসের স্থানের সঙ্গে চিকিৎসা বিলম্বের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। নিরক্ষর নারীদের চিকিৎসা নিতে দেরি হওয়ার ঝুঁকি মাধ্যমিক বা তার বেশি শিক্ষিত নারীদের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। মাসিক পারিবারিক আয় পাঁচ হাজার টাকার কম হলে এ ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলের নারীদের চিকিৎসা নিতে দেরি হওয়ার ঝুঁকি প্রায় তিন গুণ বেশি। বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে রংপুরে এই ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি, যা প্রায় ছয় গুণ। এছাড়া যেসব নারী স্বামীর সঙ্গে নিজের শারীরিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে সংকোচ বোধ করেন, তাদের চিকিৎসা বিলম্বের আশঙ্কাও দ্বিগুণের বেশি।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় গবেষকরা গ্রামাঞ্চলে স্তন ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণ সম্পর্কে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি, স্বাস্থ্যকর্মীদের বিশেষ প্রশিক্ষণ, ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসাসেবার মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলে পরীক্ষা ও রোগ নির্ণয় সেবা সম্প্রসারণ, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোর রেফারেল ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং স্বাস্থ্যবিমার মতো আর্থিক সুরক্ষা ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করেছেন।
গবেষণার প্রধান গবেষক ড. মোহাম্মদ সরোয়ার হোসেন বলেন, স্তন ক্যানসার মোকাবিলায় সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো দ্রুত রোগ শনাক্ত করা। প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যানসার শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসার সফলতার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। একই সঙ্গে চিকিৎসা ব্যয় ও মৃত্যুঝুঁকিও অনেকাংশে কমানো সম্ভব।



