হামের বিস্তারে ঝুঁকিতে শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা

ছবি: সংগৃহীত
হামে আক্রান্ত শিশুরা দীর্ঘমেয়াদি জটিলতার মুখোমুখি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের আশঙ্কা, দেশে যেসব রোগ একসময় নির্মূল বা নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছিল, সেগুলো আবার ফিরে আসতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি দেশে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে সহজেই বোঝা যায় যে সেখানে শিশুদের টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ফলে হামে আক্রান্ত শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তারা সহজেই অন্যান্য সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হতে পারে। এর ফলে পোলিও, নবজাতকের ধনুষ্টংকার, হেপাটাইটিস-বি, ডিপথেরিয়া, হুপিংকাশি, কালাজ্বর, ম্যালেরিয়া, যক্ষা ও কুষ্ঠের মতো রোগ আবারও ফিরে আসার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন তারা।
সম্প্রতি গাইবান্ধায় জলাতঙ্কে কয়েকজনের মৃত্যুর ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগে নিয়ন্ত্রণে থাকা এসব রোগ নতুন করে জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হতে পারে। তাদের ভাষায়, “এই রোগগুলো ফিরে আসবে কি না, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই; বরং কবে ফিরে আসবে, সেটাই এখন প্রশ্ন।”
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, আউটপেশেন্ট বা ওপি কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জনস্বাস্থ্য কর্মসূচিগুলো বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এতে আগে নিয়ন্ত্রণে থাকা অনেক রোগ ফের বিস্তারের ঝুঁকিতে পড়েছে।
তিনি বলেন, “একসময় দেশে জলাতঙ্কে বছরে প্রায় দুই হাজার মানুষ মারা যেত। বিভিন্ন কর্মসূচির কারণে সেই সংখ্যা ১০০-এর নিচে নেমে এসেছিল। কিন্তু এখন আবার সেই ঝুঁকি বাড়ছে। একইভাবে কালাজ্বর, ম্যালেরিয়া, যক্ষা, কুষ্ঠ, ডিপথেরিয়া ও হুপিংকাশির মতো রোগও নতুন করে দেখা দিতে পারে।”
জনস্বাস্থ্য টিকা বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী বলেন, হাম-রুবেলাসহ বিভিন্ন টিকার ঘাটতি দীর্ঘদিন ধরেই ছিল। যদিও ৬ মে থেকে নতুন করে টিকা সরবরাহ শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ ২০১৪ সালে পোলিওমুক্ত দেশের স্বীকৃতি পেয়েছিল। ২০১৯ সালে শিশুদের মধ্যে হেপাটাইটিস-বি নিয়ন্ত্রণে থাকার স্বীকৃতিও পাওয়া যায়। রুবেলাও ২০১৮ সালে নিয়ন্ত্রণে আসে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এসব রোগ আবার ফিরে আসতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, হাম শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল করে দেয়। ফলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, মস্তিষ্কে প্রদাহসহ নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে। তার মতে, কোনো দেশে হাম ছড়িয়ে পড়া মানেই সেখানে টিকাদান কার্যক্রমে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, হাম শুধু প্রাণঘাতীই নয়, এটি থেকে বেঁচে যাওয়া শিশুরাও দীর্ঘমেয়াদি নানা জটিলতায় ভুগতে পারে। অপুষ্টি, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস, চোখের ক্ষতি, রাতকানা, মস্তিষ্কে প্রদাহ (এনকেফেলাইটিস) এবং শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
তিনি বলেন, “সরকারকে এখনই বিকল্প কর্মসূচি নিতে হবে, যাতে জনস্বাস্থ্য কার্যক্রম চালু রাখা যায়। তা না হলে আজ না হোক কাল এসব রোগ আবার ফিরে আসবেই।”
ডা. তাজুল ইসলাম দ্রুত এমআর (মিজলস-রুবেলা) টিকাদান কার্যক্রম জোরদারের তাগিদ দিয়ে বলেন, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় ১০০ শিশুর মধ্যে অন্তত ৯৫ জনকে টিকার আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি শিশুদের পুষ্টিকর খাবার, মায়ের বুকের দুধ ও ভিটামিন-এ নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
ভোরের আকাশ/সু.পা



