চিকিৎসক

জয়েন্টের ব্যথা ও আঘাতে আধুনিক চিকিৎসা আর্থোস্কোপিক সার্জারি

ছবি: সংগৃহীত

মানবদেহের কঙ্কালতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো বিভিন্ন অস্থিসন্ধি বা জয়েন্ট। কোনো কারণে এই অস্থিসন্ধিগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে, বিশেষ করে কাঁধের ল্যাব্রাম বা পেশি এবং হাঁটুর মেনিসকাস বা লিগামেন্ট আঘাতপ্রাপ্ত হলে অতীতে বড় ধরনের ওপেন সার্জারির প্রয়োজন হতো।

কিন্তু আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে এখন আর বড় কোনো কাটাছেঁড়ার প্রয়োজন হয় না। ক্ষুদ্র ছিদ্র বা ‘কী-হোল’ প্রযুক্তির মাধ্যমে জয়েন্টের ভেতরের অবস্থা সরাসরি পর্যবেক্ষণ এবং চিকিৎসা করা সম্ভব হচ্ছে। এই রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা পদ্ধতিই আর্থোস্কোপিক সার্জারি নামে পরিচিত।

কোন ধরনের সমস্যায় এই চিকিৎসা কার্যকর
সাধারণত স্পোর্টস ইনজুরি বা খেলাধুলাজনিত আঘাতের কারণে লিগামেন্ট বা পেশি ছিঁড়ে যাওয়ার ঘটনা বেশি ঘটে। এছাড়া দৈনন্দিন জীবনে আকস্মিক মোচড়ানো আঘাত, নাচ বা শারীরিক ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যাওয়ার কারণেও লিগামেন্ট ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

অনেকের ক্ষেত্রে হাঁটুর বাটি বা প্যাটেলোফেমোরাল জয়েন্ট বারবার স্থানচ্যুত হয়, যা অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক একটি সমস্যা। এসব ক্ষেত্রেও আর্থোস্কোপিক পদ্ধতিতে সফল চিকিৎসা করা সম্ভব। পাশাপাশি আর্থ্রাইটিসজনিত জয়েন্ট ক্ষয়ের প্রাথমিক থেকে মধ্যম পর্যায়েও এই পদ্ধতি কার্যকর ভূমিকা রাখে।

কীভাবে কাজ করে আর্থোস্কোপি
আর্থোস্কোপিক সার্জারির বড় বৈশিষ্ট্য হলো এটি একই সঙ্গে রোগ নির্ণয় (ডায়াগনস্টিক) এবং চিকিৎসা (থেরাপিউটিক) উভয় কাজ করতে পারে। অনেক সময় সাধারণ শারীরিক পরীক্ষা বা এক্স-রে-তে জয়েন্টের ভেতরের প্রকৃত সমস্যা ধরা পড়ে না। এমন পরিস্থিতিতে জয়েন্টের ভেতরে একটি বিশেষ ক্যামেরা ও আলোযুক্ত সরু টেলিস্কোপ প্রবেশ করানো হয়। এর মাধ্যমে বাইরের মনিটরে জয়েন্টের ভেতরের অবস্থা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দেখা যায়। এই পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে চিকিৎসকরা ছিঁড়ে যাওয়া লিগামেন্ট মেরামত করতে পারেন, কাঁধের ল্যাব্রাম রিপেয়ার করতে পারেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যু পুনর্গঠন করতে পারেন।

মেনিসকাস ও তরুণাস্থির চিকিৎসা
হাঁটুর মেনিসকাস ইনজুরির ক্ষেত্রে অনেক সময় ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামত করা হয়, আবার কিছু ক্ষেত্রে নষ্ট হয়ে যাওয়া অংশ কেটে ফেলে দেওয়া হয়। এতে জয়েন্ট লক হয়ে যাওয়া বা জ্যাম হওয়ার সমস্যা কমে যায় এবং দীর্ঘদিনের ব্যথা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।

আধুনিক প্রযুক্তির সংযোজন
আর্থোস্কোপিক সার্জারিতে এখন মাইক্রোপাংচার ও মাইক্রোফ্র্যাকচার প্রযুক্তিরও সমন্বয় ঘটানো হচ্ছে। এর ফলে জয়েন্টের ভেতরের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ আরও নিখুঁতভাবে চিকিৎসা করা সম্ভব হচ্ছে।

সুবিধা কী
প্রচলিত ওপেন সার্জারির তুলনায় আর্থোস্কোপিক সার্জারিতে কাটা-ছেঁড়া কম হয়, ব্যথা তুলনামূলকভাবে কম থাকে এবং রোগী দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন। পাশাপাশি সংক্রমণের ঝুঁকিও অনেক কম। আর্থোস্কোপিক সার্জারি বর্তমানে জয়েন্ট সংক্রান্ত জটিল রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় একটি কার্যকর ও আধুনিক সমাধান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

লেখক: হাড় ও জয়েন্ট বিশেষজ্ঞ এবং আর্থোস্কোপিক সার্জন, অধ্যাপক, অর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগ, নিটোর; বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতাল লিমিটেড পিএলসি, শ্যামলী, মিরপুর রোড, ঢাকা।

ভোরের আকাশ/সু.পা

জয়েন্টের ব্যথা ও আঘাতে আধুনিক চিকিৎসা আর্থোস্কোপিক সার্জারি | স্বাস্থ্য কথা