কমছে পুরুষদের শুক্রাণুর সংখ্যা ও গুণমান

ছবি: সংগৃহীত
বিশ্বব্যাপী এক নীরব কিন্তু ক্রমবর্ধমান জনস্বাস্থ্য সংকট ঘনীভূত হচ্ছে—পুরুষদের শুক্রাণুর সংখ্যা ও গুণমান ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণার তথ্যমতে, গত পাঁচ দশকে এই প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৭৩ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে শুক্রাণুর সংখ্যা প্রতি বছর গড়ে ১ দশমিক ২ শতাংশ হারে কমেছে। তবে ২০০০ সালের পর থেকে এই হ্রাসের গতি আরও বেড়ে বার্ষিক প্রায় ২ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছে।
বংশগত ও এপিজেনেটিক প্রভাব : বিজ্ঞানীরা বলছেন, পরিবেশ ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন জিনের কার্যপ্রণালীতে এমন পরিবর্তন ঘটাতে পারে, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে স্থানান্তরিত হতে পারে। ফলে উর্বরতা সংকট ভবিষ্যতে আরও গভীর হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে বিপিএ (Bisphenol A), থ্যালেটস এবং তথাকথিত ‘ফরএভার কেমিক্যাল’ শুক্রাণুর গতিশীলতা কমিয়ে দিতে পারে এবং ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত করার ঝুঁকি তৈরি করে। এছাড়া বায়ুদূষণে থাকা ক্ষতিকর কণাও প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
আধুনিক জীবনযাত্রার প্রভাব : অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, ধূমপান, মদ্যপান এবং মাদকের ব্যবহার পুরুষদের উর্বরতা হ্রাসের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এসব জীবনধারা শুক্রাণুর সংখ্যা ও গুণমান উভয়কেই প্রভাবিত করে।
পরিবেশগত দূষণ ও রাসায়নিকের প্রভাব : বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবেশে থাকা ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ পুরুষ প্রজনন স্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে। প্লাস্টিকজাত উপাদান, ফ্লেম রিটার্ডেন্ট এবং বিভিন্ন গৃহস্থালির পণ্যে থাকা রাসায়নিক হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটায়।
জলবায়ু পরিবর্তন ও তাপমাত্রার ঝুঁকি : জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পুরুষ প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চ তাপমাত্রার সংস্পর্শ শুক্রাণুর মান কমিয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে যারা দীর্ঘসময় অতিরিক্ত গরম পরিবেশে কাজ করেন, তাদের ঝুঁকি আরও বেশি।
বয়স ও প্রজনন সক্ষমতা : সন্তান নেওয়ার ক্ষেত্রে নারীদের বয়সের পাশাপাশি পুরুষদের বয়সও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বেশি বয়সে বাবা হওয়ার ক্ষেত্রে শুক্রাণুর গুণমান কমে যেতে পারে এবং প্রজনন জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন।
উত্তরণের উপায় : বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট মোকাবিলায় জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনা জরুরি। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, প্লাস্টিকজাত পণ্য এড়িয়ে চলা এবং বিপিএ-মুক্ত পণ্য ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া বিষয়টি নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি ও চিকিৎসা পরামর্শ গ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় অর্ধেক বন্ধ্যাত্বজনিত সমস্যার পেছনে পুরুষদের প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কিত কারণ থাকতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এটি শুধু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সমস্যা নয়; বরং ভবিষ্যৎ মানবজাতির জন্য একটি বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ। তথ্যসূত্র: বিবিসি
ভোরের আকাশ/সু.পা



