টিকার সংকট ও হামে শিশুমৃত্যু নিয়ে তদন্ত শুরু : স্বাস্থ্যসেবা সচিব

দেশে হাম প্রতিরোধী টিকার সংকট, গত এক দশকের মধ্যে হামের সর্বোচ্চ প্রাদুর্ভাব এবং রোগটিতে আক্রান্ত হয়ে শিশু মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী। তিনি বলেন, টিকার সংকট এবং হামে শিশুমৃত্যুর ঘটনা তদন্ত শুরু করেছে সরকার। হামে কেন এত শিশুর মৃত্যু হলো এবং এ ক্ষেত্রে কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। তদন্তের ফলাফল সাংবাদিকসহ দেশবাসীকে জানানো হবে।
শনিবার (৯ মে) বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডা. মিল্টন হলে বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএইচআরএফ) আয়োজিত ‘হামের প্রাদুর্ভাব ও উত্তরণের পথ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বাস্থ্য সচিব বলেন, তদন্ত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। প্রত্যেকটি ঘটনার তদন্ত হওয়া প্রয়োজন এবং জনগণের তা জানার অধিকার রয়েছে। তিনি বলেন, “আমাদের সরকার একটি গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক সরকার। জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে সরকার প্রস্তুত।”
বৈঠকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, হাম-রুবেলার মতো রোগ প্রতিরোধে জাতীয় টিকাদান ক্যাম্পেইন নিয়মিত চালানো জরুরি। অথচ দেশে ২০১৯ সালের পর আর কোনো জাতীয় ক্যাম্পেইন হয়নি।
তিনি জানান, দেশে হাম আক্রান্ত শিশুদের রোগের ধরন ও জটিলতা নিরূপণে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটকে (আইইডিসিআর) জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের অনুরোধ করা হয়েছে। এছাড়া হাম ও হাম-সদৃশ উপসর্গে মৃত শিশুদের ‘ডেথ রিভিউ’ করার বিষয়টি জাতীয় টিকাদানসংক্রান্ত কারিগরি উপদেষ্টা গ্রুপে (নাইট্যাগ) উপস্থাপন করা হবে।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম বলেন, হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে, নইলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারত। দ্রুত টিকা সংগ্রহ ও দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়ন নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।
জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, দেশে মহামারির মতো পরিস্থিতি তৈরি হলেও অনেক সময় তা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করা হয় না। অথচ পরিস্থিতি স্বীকার করে সমন্বিতভাবে কাজ করলে উত্তরণ সহজ হয়। তিনি হাম মোকাবেলায় একটি জাতীয় গাইডলাইন প্রণয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেন্টাল অনুষদের ডিন ডা. সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্থ বলেন, হামের প্রাদুর্ভাবের পেছনে অবহেলা ও অপরিকল্পিত উদ্যোগ রয়েছে। তিনি বলেন, “ঠিক সময়ে টিকা আনা হয়নি, আবার যেসব টিকা এসেছে, সেগুলোরও সঠিক ব্যবহার হয়নি।”
তিনি আরও বলেন, দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে যদি এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়ে থাকে, তবে তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি ভুল স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশের সংস্কৃতি গড়ে তোলারও আহ্বান জানান তিনি।
আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, বিশ্বজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব বাড়লেও বাংলাদেশের মতো এত বেশি মৃত্যুহার অন্য কোথাও দেখা যায়নি। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, দেশের চলমান হামের প্রাদুর্ভাব আরও এক থেকে দুই মাস অব্যাহত থাকতে পারে।
তিনি বলেন, অপুষ্টিও হাম সংক্রমণের বড় কারণ। নিম্নআয়ের মানুষের পক্ষে আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রেখে পরিচর্যা করা কঠিন। এ পরিস্থিতিতে কমিউনিটি কোয়ারেন্টাইন ও জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণার মাধ্যমে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের পরামর্শ দেন তিনি।
জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের জাতীয় পোলিও ও হাম-রুবেলা ল্যাবরেটরির সাবেক প্রধান ডা. খন্দকার মাহবুবা জামিল বলেন, ভ্যাকসিনেশন গ্যাপ, ইমিউনিটি গ্যাপ এবং বুকের দুধ খাওয়ানোর হার কমে যাওয়ার কারণে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নবজাতক বিভাগের অধ্যাপক ডা. সঞ্জয় কুমার দে বলেন, শিশুদের প্রথম ছয় মাস শুধুমাত্র মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো এবং নিয়মিত টিকা নিশ্চিত করা গেলে হাম-রুবেলাসহ বিভিন্ন রোগ থেকে সুরক্ষা পাওয়া সম্ভব।
গোলটেবিল বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), আইসিডিডিআর,বি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ব্র্যাক, ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব), ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরাম (এনডিএফ) ও অন্যান্য স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি এবং বিশেষজ্ঞরা।
বিএইচআরএফের সভাপতি প্রতীক ইজাজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদ শুভ। মাঠপর্যায়ে হাম পরিস্থিতির বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক তবিবুর রহমান। গোলটেবিল বৈঠক আয়োজনে সহযোগিতা করে ইউনিমেড ইউনিহেলথ ফার্মাসিউটিক্যালস।
ভোরের আকাশ/সু.পা



