যুক্তি-তর্কেই প্রাণবন্ত বাজেট অধিবেশন

সংসদীয় গণতন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত সংসদ ভবনটি দীর্ঘ সময় পর ফিরে পেল তার প্রকৃত প্রাণচাঞ্চল্য। সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের সরব উপস্থিতি এবং পাল্টাপাল্টি যুক্তি-তর্ক এবং বিরোধী দলের ওয়াক আউটের মধ্য দিয়ে পুরো অধিবেশন অত্যন্ত প্রাণবন্ত। নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির আভাস অধিবেশনের শুরু থেকেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতি নিয়মিত। সংসদীয় কার্যক্রমে তার সরাসরি অংশগ্রহণ এবং বিরোধী দলের সমালোচনার মুখে ধৈর্যশীল ও গঠনমূলক অবস্থান এক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইঙ্গিত দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর এই সক্রিয় ভূমিকা সংসদের অন্যান্য সদস্যদেরও উৎসাহিত করেছে, যার ফলে বাজেট নিয়ে আলোচনা কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি।
বাজেট আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল দেশের তরুণ প্রজন্ম এবং তথ্য-প্রযুক্তি খাতের উন্নয়ন। প্রধানমন্ত্রীর ‘ভিশন’-এর প্রতিফলন হিসেবে বাজেটে ফ্রিল্যান্সিং, স্টার্টআপ এবং জেলা পর্যায়ে হাই-টেক পার্ক স্থাপনের জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী যখন এই বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করছিলেন, তখন সংসদ কক্ষ ছিল করতালিতে মুখর। তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকারের এই উদ্যোগকে বিশ্লেষকরা সময়ের সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
বাজেট আলোচনায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। হাসপাতালের শয্যা বৃদ্ধি ও বরাদ্দ বাড়ানোর উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও সংসদ সদস্যরা জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসা-সংকট, দুর্বল চিকিৎসাসেবা ও নানা সমস্যার কথা তুলে ধরেন। তাদের বক্তব্যে মাদক নিয়ন্ত্রণ, স্থানীয় রাস্তা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাঁধ, কৃষি প্রকল্প ও শিল্প স্থাপনের দাবিও আসে। অধিবেশনটি ‘প্রাণবন্ত ও সরব’ হয়ে ওঠার পেছনে বিরোধী দলের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। ছায়া বাজেটের আদলে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা প্রতিটি খাতের বরাদ্দের ওপর সুনির্দিষ্ট সমালোচনা এবং বিকল্প প্রস্তাব পেশ করেন। বিশেষ করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের নিয়ে তাদের জোরালো বক্তব্য অধিবেশনকে জমজমাট করে তোলে। স্পিকারের নিরপেক্ষ ভূমিকা এবং উভয় পক্ষকে সমান সুযোগ প্রদান সংসদীয় মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে।
সুশাসনের অঙ্গীকার ও জনকল্যাণ সমাপনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ওপর বিশেষ জোর দেন। তিনি স্পষ্ট করেন যে, সরকারি অর্থের প্রতিটি পয়সা জনগণের কল্যাণে ব্যয় হতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা এবং প্রশাসনিক সংস্কারের যে রূপরেখা তিনি সংসদে তুলে ধরেন, তা উপস্থিত সবার প্রশংসা কুড়ায়। তার ভাষণে আগামীর সমৃদ্ধ ও আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার এক স্পষ্ট প্রতিফলন লক্ষ্য করা গেছে।
বাজেট অধিবেশন শেষে সংসদ ভবন থেকে বের হওয়ার সময় অনেক জ্যেষ্ঠ সদস্য মন্তব্য করেন যে, অনেক বছর পর জাতীয় সংসদে এমন প্রাণবন্ত ও কার্যকর আলোচনা তারা প্রত্যক্ষ করলেন। সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই অধিবেশন নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে, যা দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় এক ইতিবাচক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে এ অধিবেশনে বিশেষ কিছু ইস্যুতে তর্ক-বিতর্কে সংসদ সরব ছিল বলেও মনে করছেন রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা।
বিশিষ্টজনরা বলছে, বাজেট আলোচনায় সরকারি দলের সদস্যদের বক্তব্যে ঘুরেফিরে এসেছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্ব ও প্রস্তাবিত বাজেটের প্রশংসা। তাঁরা বাজেটকে বৃহৎ, জনকল্যাণমুখী, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষিবান্ধব হিসেবে তুলে ধরেন।
এমপিদের মতে, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, সামাজিক নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানে বরাদ্দ বৃদ্ধির মাধ্যমে মানুষের জীবনমান উন্নয়নের চেষ্টা করা হয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে কর কমানোর প্রস্তাবে সাধারণ মানুষ স্বস্তি পাবে বলেও সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়।
অন্যদিকে বিরোধী দলের সদস্যরা বাজেটকে অতি উচ্চাভিলাষী ও ঋণনির্ভর বলে বর্ণনা করেন। তাঁদের মতে, বড় বাজেটের চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে এর বাস্তবায়ন। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ঋণের চাপ, রাজস্ব আহরণ, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা নিশ্চিত না হলে বাজেটের সুফল পাওয়া যাবে না। এসবের জন্য কাঠামোগত সংস্কার জরুরি বলেও তাঁরা মত দেন। এর বাইরে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সুদমুক্ত ও জাকাতভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু এবং অর্থবছর জানুয়ারি-ডিসেম্বর করার দাবিও ওঠে।
বাজেট আলোচনায় অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক বিষয় ছিল ১৯৭১ সালে বর্তমান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা। বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে বেশ কয়েকজন সরকার দলীয় সংসদ সদস্য মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকার সমালোচনা করেন। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের মতো শীর্ষ পর্যায়ের নেতারাও জামায়াতের সমালোচনা করেন।
মুক্তিযুদ্ধে দলের ভূমিকা নিয়ে সরাসরি ব্যাখ্যা না দিলেও জামায়াতের সংসদ সদস্য এ টি এম আজহারুল ইসলাম পাল্টা প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, জামায়াত না থাকলে সেই রাজনৈতিক শূন্যতা কে পূরণ করবে? সরকার আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করতে চাইছে কি না, সে প্রশ্নও রাখেন তিনি।
ইসলামী ব্যাংক নিয়ে বিতর্ক: এ অধিবেশনে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের আনা একটি প্রস্তাবে ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা, ব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে ব্যাপক বিতর্ক হয়।
নির্ধারিত ওই বিতর্কের বাইরেও বাজেট আলোচনায় বিরোধী দলের অনেক সদস্য ইসলামী ব্যাংক নিয়ে বক্তব্য দেন। ঋণখেলাপি, অর্থ পাচার, এস আলম, আদানি ও সামিটের সঙ্গে চুক্তির বিষয়েও সরকারের অবস্থান জানতে চাওয়া হয় বিরোধী দলের পক্ষ থেকে।
‘পুশইন’ নিয়ে আলোচনা স্থগিত: ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক ‘পুশইন’ ও সীমান্ত হত্যা নিয়ে আলোচনার জন্য একটি নোটিশ দিয়েছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম। নোটিশটি গ্রহণ করে আলোচনার দিনও ঠিক করা হয়েছিল।
কিন্তু ১৪ জুন আলোচনার নির্ধারিত দিনে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল জানান, ‘অনিবার্য কারণে’ এ আলোচনা স্থগিত করা হয়েছে। এ নিয়ে আহমাদ বিন কাসেম প্রশ্ন তুললে ডেপুটি স্পিকার জানান, বাজেট অধিবেশনের সময় সংকটের কারণে আলোচনা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে ধন্যবাদ প্রস্তাব : চলতি অধিবেশন চলাকালেই ২১ থেকে ২৬ জুন পর্যায়ক্রমে মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান। তিনি দেশে ফেরার পরদিন ২৭ জুন প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে সর্বসম্মতিক্রমে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে সংসদ।
স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রস্তাবটি আনেন। প্রস্তাবে বলা হয়, সংসদের অভিমত, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২১ থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত মালয়েশিয়া এবং চীন সফরে অভূতপূর্ব সাফল্যের জন্য এই মহান সংসদ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমানকে ধন্যবাদ জানাচ্ছে।
প্রস্তাবটির ওপর আলোচনায় অংশ নেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। পরে কণ্ঠভোটে প্রস্তাবটি গৃহীত হয়।
বিরোধী দলের ওয়াকআউট : চলমান এই অধিবেশনে এক দিন ওয়াকআউট করে বিরোধী দল। গত ২৮ জুন বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা ও দলটির রাজনীতির সমালোচনা করেন। সেদিন সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে বিরোধী দল।
প্রসঙ্গত, গত ৭ জুন শুরু হয় বাজেট অধিবেশন। ১১ জুন সংসদে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। দীর্ঘ আলোচনা শেষে গত ৩০ জুন বাজেট পাস হয়। তবে অধিবেশন এখনো শেষ হয়নি। ৭ জুলাই পর্যন্ত অধিবেশন মুলতবি রাখা হয়েছে। ওই দিন আবার বৈঠক বসবে।
সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, এবার বাজেটের ওপর মোট ৪৮ ঘণ্টা ৫৪ মিনিট আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে সম্পূরক বাজেটের ওপর ৩ ঘণ্টা ৩ মিনিট এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের ওপর ৪৫ ঘণ্টা ৫১ মিনিট আলোচনা হয়।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতাসহ মোট ২৯১ জন সংসদ সদস্য বক্তব্য দেন। তাঁদের মধ্যে সরকারি দলের সদস্য ছিলেন ২০০ জন, আর বিরোধী দলের ৯১ জন।
ভোরের আকাশ/এসএইচ