ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের ফলে গোলাবারুদের ঘাটতি তৈরি হয়েছে: মার্কিন সামরিক বাহিনী

ইরানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল যুদ্ধের কারণে মার্কিন সামরিক বাহিনীর উন্নত অস্ত্রের মজুতে কৌশলগত ঘাটতি এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় গুরুতর সংকট তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও ইউএসএআইডির মহাপরিদর্শকদের যৌথ মূল্যায়নের ভিত্তিতে তৈরি একটি আনুষ্ঠানিক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
আল আরাবিয়া সংবাদপত্র লিখেছে, অস্ত্রের মজুদ পর্যাপ্ত থাকার বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের দাবির সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র উঠে এসেছে পরিদর্শকের এই প্রতিবেদনে।
মার্কিন কংগ্রেসে জমা দেওয়া এ ধরনের প্রথম বাধ্যতামূলক এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র আনুমানিক ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন বা ৩ হাজার ৩৪০ কোটি ডলার।
এর মধ্যে কেবল ব্যবহৃত গোলাবারুদের পেছনেই খরচ হয়েছে ২২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার।
প্রতিবেদনে বলা হয়, “অপারেশন এপিক ফিউরিতে বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ ব্যবহারের ফলে সামরিক বাহিনীর কৌশলগত মজুদে ঘাটতি দেখা দিয়েছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা প্রকাশ্যে এসেছে।”
ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড সেন্টকমের তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিম এশিয়ায় ইরানের সামরিক ক্ষমতা বিস্তারের সুযোগ গুঁড়িয়ে দিতে ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে পরিচালিত যৌথ সামরিক অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’।
অস্ত্রের ঘাটতি সামাল দিতে ও সরবরাহ বিলম্ব কমাতে পেন্টাগন কেনাকাটার প্রক্রিয়া সহজ করা এবং গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জাম ও গোলাবারুদের মজুদ বাড়ানোর চেষ্টা করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে কারখানাগুলোতে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন বলেও সতর্ক করা হয়।
অনেক বড় ও শত্রুভাবাপন্ন প্রতিবেশী দেশের হুমকি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের ওপর নির্ভরশীল ইউক্রেইন ও তাইওয়ানের মতো দেশগুলোর জন্য এই ঘাটতি বড় উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইউক্রেইনের জরুরি ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি ‘প্যাট্রিয়ট’ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্র প্রয়োজন।
অন্যদিকে স্বশাসিত দ্বীপ তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ড হিসেবে দাবি করা চীনের সম্ভাব্য হামলা ঠেকিয়ে রাখতে তাইপেই ওয়াশিংটনের সঙ্গে হওয়া অস্ত্র চুক্তির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করে।
পশ্চিম এশিয়ায় গত ছয় মাসের যুদ্ধ চলাকালে গোলাবারুদে ঘাটতি হওয়ার কথা বারবার উড়িয়ে দিয়েছেন ট্রাম্প।
সম্প্রতি তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ‘প্রায় সীমাহীন’ গোলাবারুদ রয়েছে।
এমনকি সোমবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন সবচেয়ে অত্যাধুনিক ও উচ্চমানের অস্ত্র তৈরি করা হচ্ছে।
তবে সিএনএনের এক প্রতিবেদনে আগেই বলা হয়েছিল, দূরপাল্লার নিয়ন্ত্রিত ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের চরম সংকট থাকায় ইরান যুদ্ধে ট্রাম্পের কৌশল বড় ধাক্কা খেয়েছে।
মার্কিন বাহিনীর ব্যবহৃত ‘থাড’ প্রতিঘাতকারী ক্ষেপণাস্ত্রের প্রায় ৮০ শতাংশ মজুদই শেষ হয়ে এসেছে।
সেন্টকম জানায়, যুদ্ধ শুরুর প্রথম ২৪ ঘণ্টাতেই এক হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।
তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এত বড় মাত্রার হামলা আর চালানো সম্ভব হয়নি। পেন্টাগনের প্রতিবেদনে মার্কিন বহরের ব্যাপক ক্ষতির বিষয়টিও নিশ্চিত করা হয়েছে।
এতে ৪টি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ধ্বংস, ১টি এফ-৩৫ এবং ৭টি কেসি-১৩৫ ট্যাংকার বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া ইরানের হামলায় সর্বোচ্চ ৩০টি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন ধ্বংস হয়েছে।
একই সঙ্গে বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর প্রধান রসদ কেন্দ্রটিতে ইরান ড্রোন ও ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছিল বলে পরিদর্শকদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইরাক, ওমান ও জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটির শত শত ভবন ও স্থাপনা ইরানি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত সব ঘাঁটি নতুন করে তৈরি করা হবে কি না কিংবা সেটির ব্যয় কে বহন করবে তা এখনও অস্পষ্ট থাকায় এসব ক্ষয়ক্ষতির আনুমানিক ব্যয় এই প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩০ জুন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে এই অভিযানে সংঘাতকালীন লড়াইয়ে ৭ জন এবং অ-যুদ্ধকালীন ঘটনায় আরও ৭ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। এছাড়া যুদ্ধক্ষেত্রে আহত হয়েছেন ৪১৭ জন সেনা।
গেল ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে আক্রমণ করে চলমান যুদ্ধের সূচনা করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। বহু বছর ধরে পশ্চিমা দেশগুলো ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টার অভিযোগ আনলেও তেহরান তা সবসময় অস্বীকার করে আসছে।