ইরান যুদ্ধে প্রকাশিত সংখ্যার চেয়ে বেশি সেনা হারিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র

চলমান ইরান যুদ্ধে পেন্টাগন প্রকাশিত আনুষ্ঠানিক সংখ্যার চেয়েও বেশি মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে বলে মার্কিন প্রভাবশালী একটি সংবাদমাধ্যম সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
যুদ্ধে এ পর্যন্ত অন্তত ২২ জন মার্কিন সেন সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। পেন্টাগনের প্রকাশ্য তথ্যভাণ্ডার ডিফেন্স ক্যাজুয়ালটি এনালাইসিস সিস্টেম বা ‘ডিসিএএস’-এ যে ১৮ জনের মৃত্যুর কথা উল্লেখ আছে, বাস্তবে নিহতের সংখ্যা তার চেয়ে অন্তত চারজন বেশি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ষষ্ঠ এক কর্মকর্তা জানান, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প প্রশাসন ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ২৩ জন মার্কিন সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন। এই কর্মকর্তা আরও জানান, সব নিহতের ঘটনাই সরাসরি যুদ্ধের সঙ্গে জড়িত না হলেও তারা মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই দায়িত্বরত ছিলেন।
এর পাশাপাশি সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে নিয়োজিত অন্তত তিনজন বেসামরিক মার্কিন ঠিকাদার বা কন্ট্রাক্টরও প্রাণ হারিয়েছেন বলে তিনি নিশ্চিত করেছেন।
পেন্টাগনের তথ্যভাণ্ডারে শুক্রবার পর্যন্ত শত্রুভাবাপন্ন ও অ-শত্রুভাবাপন্ন উভয় ধরনের হামলায় মোট ১৮ জন মার্কিন সেনার মৃত্যুর তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে অপ্রকাশিত এই নিহত সেনাদের নাম-পরিচয় এবং কখন, কীভাবে ও কোথায় তারা মারা গেছেন- সেসব তথ্য এখনও স্পষ্ট করা হয়নি।
সরকারি তথ্যে পুরো সত্য প্রতিফলিত না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তবে তথ্যের এই গরমিল নিয়ে পেন্টাগনের পক্ষ থেকে কোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়নি।
আসন্ন নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরান যুদ্ধ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার দল রিপাবলিকান পার্টির জন্য বড় ধরণের রাজনৈতিক দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে ইরান যুদ্ধে নিহত চারজন মার্কিন সেনার নাম পেন্টাগনের তালিকা থেকে সাময়িকভাবে বাদ দেওয়া হলে ট্রাম্প প্রশাসনের সেনা মৃত্যুর হিসাব নিয়ে বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনা হয়।
সেনাদের মৃত্যুর সঠিক হিসাব কেবল তথ্যের স্বচ্ছতার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং একজন সেনার মৃত্যুর পর সামরিক বাহিনীর তদন্তের মাধ্যমেই নির্ধারিত হয় তার পরিবার সরকারি সুবিধা ও সাহায্য পাবে কি না।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত পেন্টাগনের ডাটাবেজে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে ট্রাম্প প্রশাসনের পরিচালিত ইরান অভিযানে ১৪ জনের মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে। আর ‘ওভারসিজ অপারেশন্স’ বা বিদেশি অভিযান বিভাগে চারজনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা গত জুলাইয়ের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির সময়ের ঘটনা।
এছাড়া গত ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান যুদ্ধের বাইরে অন্যান্য মিশনে যুক্ত থাকা অবস্থায় আরও দুই মার্কিন সেনার মৃত্যু হয়েছে বলে জানায় পেন্টাগন। এই সেনাদের ঘাঁটিগুলোতে ইরানি বাহিনী হামলা চালালেও ডাটাবেজে তাদের মৃত্যুর বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
পেন্টাগনের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, আইসিস বিরোধী ‘অপারেশন ইনহেরেন্ট রিভলভ’ মিশনে নিয়োজিত থাকা সার্জেন্ট ডেভিন সাইবেল গত ৩১ মে ইরাকের এরবিলে একটি প্রশিক্ষণ দুর্ঘটনার সময় মারা যান। তবে পেন্টাগনের ডাটাবেজের তালিকায় তার নাম পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে ‘অপারেশন স্পার্টান শিল্ড’ মিশনে নিয়োজিত থাকা মেজর সরফলি ডাভিয়াস গত ৬ মার্চ কুয়েতে একটি অস্পষ্ট শারীরিক জটিলতায় মারা যান। তবে তার মৃত্যুর সঙ্গে ইরানি হামলার সরাসরি যোগসূত্র ছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়।
পেন্টাগনের ডাটাবেজ অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে অন্তত ৮২০ জনেরও বেশি মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ইরানের পাল্টা হামলায় তাদের অনেকেই মস্তিষ্কে মারাত্মক আঘাত বা ট্রমাটিক ব্রেইন ইনজুরিতে ভুগছেন।
দীর্ঘায়িত এই যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদের ভাণ্ডার খালি হয়ে আসছে ও পারস্য উপসাগরের একাধিক মার্কিন ঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাছাড়া তেহরান বিশ্ব খনিজ তেল ও সার পরিবহনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রুট ‘হরমুজ প্রণালি’ বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের দেখা একটি নথি অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) হিসাব করে দেখেছে যে, সেপ্টেম্বর মাসের শুরু পর্যন্ত এই ইরান যুদ্ধে আনুমানিক ৪৩.৬ বিলিয়ন (৪ হাজার ৩৬০ কোটি) ডলার খরচ হয়েছে। এর মধ্যে কেবল ব্যবহৃত অস্ত্রের পেছনেই খরচ হয়েছে ২৮ বিলিয়ন বা ২ হাজার ৮০০ কোটি ডলার। অবশ্য এই হিসাবে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ক্ষয়ক্ষতির হিসাব ধরা হয়নি।
গত মাসে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে সতর্ক করে বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা জানান, ইরানের বিরুদ্ধে এমন বড় আকারের দীর্ঘমেয়াদী সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখা সম্ভব নয়। এটি মার্কিন ভূখণ্ডসহ অন্যান্য অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দেশের সামরিক সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
সেপ্টেম্বর মাসে রয়টার্স-ইপসোসের প্রকাশিত এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ২৮ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ট্রাম্পের এই ইরান নীতি সমর্থন করেন, যেখানে ৬২ শতাংশ সাধারণ মানুষ সরাসরি এর বিরোধিতা করেছেন।
এমন পরিস্থিতির মধ্যে গত মঙ্গলবার প্রতিনিধি পরিষদে ট্রাম্পের নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির রেকর্ডসংখ্যক সাতজন আইনপ্রণেতা ডেমোক্র্যাটদের সাথে যোগ দিয়ে যুদ্ধ বন্ধের একটি প্রতীকি প্রস্তাবে ভোট দেন। মার্কিন কংগ্রেসে যুদ্ধ ক্ষমতা সীমিত করার জন্য এটি অন্যতম এক বড় পদক্ষেপ।
চলতি গ্রীষ্মে নিহত চার মার্কিন সেনার নাম যখন পেন্টাগনের ডাটাবেজ থেকে সাময়িকভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তখন ট্রাম্প প্রশাসন ইরান সংঘাতকে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র পরিবর্তে সাধারণ ‘ওভারসিজ অপারেশন্স’ হিসেবে পুনর্সংজ্ঞায়িত করেছিল।
সে সময় তেহরানের সাথে একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তির চেষ্টা চলাকালীন ইরান যুদ্ধকে একটি সফল অভিযান হিসেবে তুলে ধরতেই মার্কিন প্রশাসন সেনার মৃত্যুর খবর গোপন করার চেষ্টা করেছিল বলে মনে করা হয়।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে পেন্টাগনের এই সেনা ক্যাজুয়ালটি তথ্য নিয়ে তদন্ত চালানোর ঘোষণা দিয়েছে ডেমোক্র্যাট দল।
এরই মধ্যে শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) সাবেক সেনাসদস্য ডেমোক্র্যাটিক প্রতিনিধি প্যাট রায়ান ও জেসন ক্রোসহ ১২ জন আইনপ্রণেতা পেন্টাগনের তথ্যের কারচুপি বন্ধে নতুন বিল আনার ঘোষণা দিয়েছেন। সেনেটর ট্যামি ডাকওয়ার্থও সিনেটে একই ধরনের বিল উত্থাপন করেছেন।
অন্যদিকে, রিপাবলিকান প্রতিনিধি থমাস ম্যাসি ১৯৭৩ সালের ওয়ার পাওয়ার অ্যাক্ট বা যুদ্ধ ক্ষমতা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে অভিশংসনের (ইমপিচমেন্ট) দাবি তুলে প্রতিনিধি পরিষদে প্রস্তাব পাস করার উদ্যোগ নিয়েছেন।
ভোরের আকাশ/আ.র