ভূমিকম্পের বৃদ্ধি কি কিয়ামতের ইঙ্গিত?

সাম্প্রতিক সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে, এমনকি আমাদের অঞ্চলেও ঘন ঘন ছোট-বড় ভূমিকম্প অনুভূত হচ্ছে। মাটির আকস্মিক এই কেঁপে ওঠা মানুষের মনে যেমন চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করে, তেমনি অনেককে ধর্মীয় ও পারলৌকিক চিন্তায় মগ্ন করে তোলে। ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের মনে প্রায়ই একটি প্রশ্ন উঁকি দেয়—এই যে ঘন ঘন ভূমিকম্প হচ্ছে, এটি কি আসলেই কেয়ামতের কোনো লক্ষণ বা আলামত?
পবিত্র কোরআন এবং মহানবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ-এর একাধিক সহীহ হাদিসের আলোকে এই প্রশ্নের উত্তর অত্যন্ত স্পষ্ট। ইসলাম অনুযায়ী, ঘন ঘন ভূমিকম্প হওয়া শেষ জামানা বা কেয়ামতের অন্যতম একটি প্রধান আলামত।
নিচে এ বিষয়ে ইসলামি শরিয়তের বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও দলিল তুলে ধরা হলো:
১. হাদিসের আলোকে ভূমিকম্প ও কেয়ামতের সম্পর্ক
কেয়ামত বা মহাপ্রলয় কখন ঘটবে, তার সুনির্দিষ্ট জ্ঞান একমাত্র মহান আল্লাহ তাআলার কাছেই রয়েছে। তবে শেষ জামানায় কেয়ামত কাছাকাছি চলে এলে পৃথিবীতে কী কী লক্ষণ দেখা দেবে, রাসূলুল্লাহ ﷺ তা উম্মতকে জানিয়ে গেছেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো ভূমিকম্পের আধিক্য।
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—
“কেয়ামত ততক্ষণ পর্যন্ত সংঘটিত হবে না, যতক্ষণ না ইলম (দ্বীনি জ্ঞান) তুলে নেওয়া হবে, সময়ের দূরত্ব সংকুচিত হয়ে আসবে (সময় দ্রুত চলে যাবে), ঘন ঘন ভূমিকম্প হবে, ফিতনা-ফ্যাসাদ প্রকাশ পাবে এবং ‘হারজ’ বৃদ্ধি পাবে।” সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! ‘হারজ’ কী? তিনি বললেন, “হত্যাযজ্ঞ, ব্যাপক হত্যাকাণ্ড।” (সহীহ বুখারী, হাদিস নং- ১০৩৬)
এই হাদিসটি প্রমাণ করে যে, কেয়ামতের পূর্বমুহূর্তে পৃথিবীতে প্রাকৃতিক বিপর্যয় হিসেবে ভূমিকম্পের সংখ্যা এবং তীব্রতা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেড়ে যাবে।
২. ভূমিকম্প কেন হয়: ইসলামি দৃষ্টিকোণ
আধুনিক বিজ্ঞান অনুযায়ী টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়া বা ভূ-অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের কারণে ভূমিকম্প হয়, যা সম্পূর্ণ সত্য। তবে ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে এই বাহ্যিক বৈজ্ঞানিক কারণের পেছনে একটি আধ্যাত্মিক কারণও রয়েছে। ইসলাম মনে করে, সবকিছুর নিয়ন্ত্রক একমাত্র আল্লাহ এবং প্রকৃতিতে যেকোনো বিপর্যয় মানুষের অবাধ্যতা ও পাপের ফলেই ঘটে থাকে।
যখন কোনো সমাজে অন্যায়, অবিচার, জুলুম, ব্যভিচার, সুদ-ঘুষ এবং মদ্যপানের মতো পাপ কাজ চরম সীমায় পৌঁছে যায় এবং মানুষ আল্লাহকে ভুলে দুনিয়ার মোহে মত্ত হয়, তখন আল্লাহ তাআলা মানুষকে সতর্ক করার জন্য এবং তাঁর শক্তির মহড়া দেখাতে জমিনকে কাঁপিয়ে দেন।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন:
“মানুষের কৃতকর্মের দরুন স্থলে ও জলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে, যাতে তিনি তাদেরকে তাদের কোনো কোনো কাজের শাস্তি আস্বাদন করান, যাতে তারা ফিরে আসে।” (সূরা আর-রূম, আয়াত: ৪১)
ভূমিকম্পের সময় একজন মুমিনের করণীয়:
ভূমিকম্প কেবল একটি ভৌগোলিক ঘটনাই নয়, এটি বান্দার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি সতর্কবার্তা ও ভয় প্রদর্শনের মাধ্যম। তাই ভূমিকম্পের সময় বা এর পরপরই মুসলিমদের কিছু বিশেষ আমল ও আচরণ করা উচিত:
- বেশি বেশি তওবা ও ইস্তিগফার করা: নিজের কৃত পাপের জন্য আল্লাহর কাছে খাঁটি মনে ক্ষমা চাওয়া এবং পাপের পথ ছেড়ে দেওয়ার অঙ্গীকার করা।
- আল্লাহকে স্মরণ করা ও দোয়া করা: বিপদের সময় আল্লাহর দরবারে কাতর হয়ে 'আল্লাহু আকবার' (আল্লাহ মহান) বলা এবং বেশি বেশি ইস্তিগফার পড়া।
- দান-সদকা করা: খলিফাতুল মুসলিমীন ওমর বিন আব্দুল আজিজ (রহ.) তাঁর শাসন আমলে ভূমিকম্প হলে গভর্নরদের লিখে পাঠাতেন, যেন তারা জনগণকে দান-সদকা করার নির্দেশ দেন। কারণ সদকা আল্লাহর গজব ও বিপদ দূর করে।
- অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো: ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত বা আতঙ্কিত মানুষের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করা এবং সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের সাহায্য করা।
ঘন ঘন ভূমিকম্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, এই পৃথিবী চিরস্থায়ী নয় এবং মহাবিশ্বের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ কেবলই মহান আল্লাহর হাতে। তাই এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়গুলোকে কেবল আবহাওয়ার সাধারণ পরিবর্তন হিসেবে না দেখে, এগুলোকে আখেরাতের প্রস্তুতির চূড়ান্ত তাগিদ হিসেবে নেওয়া উচিত। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সব ধরণের প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করুন এবং ঈমানের সাথে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমীন।
ভোরের আকাশ/জেআ