এতিম ও বিধবার প্রতি ইসলামের দায়িত্ব ও নির্দেশনা

সমাজে সবচেয়ে অসহায়, পেছনের সারির এবং সুরক্ষাহীন শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত হলো এতিম ও বিধবারা। অজ্ঞতার অন্ধকারে নিমজ্জিত প্রাক-ইসলামী যুগে (জাহেলিয়াত) এতিম ও বিধবারা ছিল চরম অবহেলা, নির্যাতন ও বঞ্চনার শিকার। কিন্তু মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আনীত ইসলাম সমাজে তাদের কেবল মর্যাদাই নিশ্চিত করেনি, বরং তাদের অধিকার রক্ষা করাকে ঈমান ও ইবাদতের অংশ হিসেবে ঘোষণা করেছে।
ইসলামী শরিয়তে এতিম ও বিধবাদের অধিকার নিশ্চিতকরণে যে সুনির্দিষ্ট ও কঠোর নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে, তা নিচে আলোচনা করা হলো:
১. এতিমের অধিকার ও ইসলাম
ইসলামে বাবার ছায়াহীন অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানকে ‘এতিম’ বলা হয়। পবিত্র কোরআনের ২৩টি সুরার বহু আয়াতে এতিমদের অধিকার ও তাদের সাথে সদব্যবহারের নির্দেশ এসেছে।
ক. সম্পদ সুরক্ষা ও আত্মসাৎ না করা
এতিমের ধনসম্পদ গ্রাস করাকে ইসলামে অন্যতম মারাত্মক কবিরা গুনাহ হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে।
মহান আল্লাহ তাআলা সতর্ক করে বলেন:
“যারা অন্যায়ভাবে এতিমদের ধনসম্পদ ভক্ষণ করে, তারা মূলত নিজেদের পেটে আগুনই ভক্ষণ করে এবং সত্ত্বরই তারা জ্বলন্ত আগুনে প্রবেশ করবে।” (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১০)
খ. সম্মান ও মায়াপূর্ণ ব্যবহার
এতিমকে কখনো হেয় বা ধমক দেওয়া যাবে না।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
“অতএব আপনি এতিমের প্রতি কঠোর হবেন না।” (সূরা আদ-দুহা, আয়াত: ৯)
গ. জান্নাতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নৈকট্য লাভ
এতিমের লালন-পালনকারীর জন্য মহা পুরস্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর তর্জনী ও মধ্যমা আঙুল পাশাপাশি দুটি একত্র করে ইঙ্গিত করে বলেন:
“আমি ও এতিমের তত্ত্বাবধানকারী ব্যক্তি জান্নাতে এভাবে (একসাথে) অবস্থান করব।” (সহীহ বুখারী, হাদিস নং- ৫৩০৪)
২. বিধবার অধিকার ও ইসলাম
স্বামীহারা নারীদের সম্মানজনক পুনর্বাসন ও অর্থনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করতে ইসলাম বৈপ্লবিক পদক্ষেপ নিয়েছে।
ক. মিরাস বা সম্পত্তিতে সুনির্দিষ্ট অধিকার
জাহেলিয়াতের যুগে স্বামী মারা গেলে স্ত্রীকে গৃহহীন করা হতো বা সম্পদের মতো উত্তরাধিকার সূত্রে বণ্টন করা হতো। ইসলাম বিধবা নারীকে স্বামীর সম্পদের সুনির্দিষ্ট উত্তরাধিকারী বা অংশীদার করেছে। (সন্তান থাকলে ৮ ভাগের ১ ভাগ, এবং সন্তান না থাকলে ৪ ভাগের ১ ভাগ সম্পদ বিধবা স্ত্রী পাবেন)।
খ. পুনর্বাসন ও পুনর্বিবাহের পূর্ণ স্বাধীনতা
ইদ্দত (চার মাস ১০ দিন) পালনের পর কোনো বিধবা নারী যদি পুনরায় বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে চান, তবে তাঁকে বাধা দেওয়া ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম। স্বাচ্ছন্দ্য ও সম্মানের সাথে জীবনযাপন করতে পুনর্বিবাহ করা তাঁর মৌলিক অধিকার।
গ. জীবনযাত্রার আর্থিক দায়িত্ব
বিধবার দেখাশোনা করা এবং তাদের সাহায্য করাকে জিহাদ ও ইবাদতের মর্যাদায় উন্নীত করা হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:
“বিধবা ও মিসকিনদের (সাহায্যের) জন্য যে ব্যক্তি প্রচেষ্টা চালায়, সে যেন আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারী অথবা রাতে অনবরত সালাত আদায়কারী এবং দিনে অনবরত সিয়াম পালনকারীর মতো।” (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)
৩. সমাজের প্রতি দায়িত্ব ও গুরুত্ব
একটি সুশীল ও তাকওয়ানির্ভর সমাজের মাপকাঠি হলো সেখানে অসহায় মানুষরা কেমন আছে। কোরআনে কারীমে নামাজ আদায় ও রোজা রাখার পাশাপাশি এতিম-অনাথদের খাদ্য না দেওয়া এবং তাদের অধিকার বঞ্চিত করাকে ‘দ্বীনকে অস্বীকার করার’ সমতুল্য গণ্য করা হয়েছে (সূরা আল-মাউন)।
এতিম ও বিধবাদের অধিকার রক্ষা করা কেবল মানবিক দায়িত্ব নয়, বরং এটি পরকালে নাজাত লাভের অন্যতম প্রধান উপায়। সমাজের সর্বস্তরের মানুষ, বিশেষ করে বিত্তবানদের উচিত তাদের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের অধিকার সঠিকভাবে বুঝিয়ে দেওয়া।
ভোরের আকাশ/জেআ