এল নিনো কীভাবে বদলে দেয় পৃথিবীর আবহাওয়া?

বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, খরা, বন্যা এবং অস্বাভাবিক আবহাওয়ার পেছনে প্রায়ই যে নামটি শোনা যায়, তা হলো ‘এল নিনো’। জলবায়ুবিজ্ঞানীদের মতে, এটি পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক জলবায়ু ঘটনা, যা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়া ও পরিবেশে ব্যাপক প্রভাব ফেলে।
প্রতি কয়েক বছর পরপর দেখা দেওয়া এই প্রাকৃতিক ঘটনাটি কখনও কোনো দেশে দীর্ঘস্থায়ী খরা তৈরি করে, আবার কোথাও অতিবৃষ্টি ও বন্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে কৃষি, খাদ্য উৎপাদন, অর্থনীতি এবং মানুষের জীবনযাত্রা সরাসরি এর প্রভাবে আক্রান্ত হতে পারে।
এল নিনো কী?
এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা। স্প্যানিশ ভাষায় ‘এল নিনো’ শব্দের অর্থ ‘শিশুপুত্র’ বা ‘খ্রিস্ট শিশু’।
দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলীয় জেলেরা বহু আগে লক্ষ্য করেছিলেন, বছরের নির্দিষ্ট সময়ে সমুদ্রের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উষ্ণ হয়ে ওঠে। পরে বিজ্ঞানীরা এ ঘটনাকে ‘এল নিনো’ নামে চিহ্নিত করেন।
কীভাবে সৃষ্টি হয়?
স্বাভাবিক অবস্থায় প্রশান্ত মহাসাগরে পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম দিকে প্রবাহিত বাণিজ্যিক বায়ু (Trade Winds) সমুদ্রের উষ্ণ পানিকে পশ্চিম অংশে ঠেলে দেয়। ফলে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে উষ্ণ পানি জমা হয় এবং পূর্ব অংশে অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা পানি ভেসে ওঠে।
কিন্তু কোনো কারণে এই বায়ুপ্রবাহ দুর্বল হয়ে পড়লে বা দিক পরিবর্তন করলে উষ্ণ পানি পূর্ব দিকে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বেড়ে যায় এবং সৃষ্টি হয় এল নিনো।
পৃথিবীতে কী প্রভাব ফেলে?
তাপমাত্রা বৃদ্ধি
এল নিনোর সময় বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা সাধারণত বৃদ্ধি পায়। অনেক সময় এটি বিশ্বের সবচেয়ে উষ্ণ বছরগুলোর অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে।
খরা ও পানির সংকট
অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু অঞ্চলে এল নিনোর কারণে বৃষ্টিপাত কমে যায়। এতে খরা, পানির সংকট এবং বনাঞ্চলে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বাড়ে।
অতিবৃষ্টি ও বন্যা
অন্যদিকে দক্ষিণ আমেরিকা ও উত্তর আমেরিকার কিছু অঞ্চলে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত দেখা যায়। এতে বন্যা, ভূমিধস এবং অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা বাড়তে পারে।
কৃষিতে প্রভাব
আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয়। খাদ্যশস্যের উৎপাদন কমে গেলে খাদ্যের দাম বাড়তে পারে এবং খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি
সমুদ্রের উষ্ণতা বেড়ে গেলে মাছের প্রজনন ও খাদ্যচক্রে পরিবর্তন আসে। অনেক সামুদ্রিক প্রাণীর স্বাভাবিক আবাসস্থলও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাংলাদেশের ওপর প্রভাব
বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনোর প্রভাবে বাংলাদেশে তাপপ্রবাহের মাত্রা বৃদ্ধি পেতে পারে। একই সঙ্গে বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ধরন পরিবর্তিত হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। এতে কৃষি, পানি সম্পদ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।
বিজ্ঞানীদের সতর্কতা
জলবায়ুবিজ্ঞানীরা বলছেন, এল নিনো একটি প্রাকৃতিক ঘটনা হলেও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে এর প্রভাব আরও তীব্র হতে পারে। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং পরিবেশবান্ধব নীতি গ্রহণের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
পৃথিবীর আবহাওয়া ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এল নিনো। এটি সরাসরি মানুষের নিয়ন্ত্রণে না থাকলেও এর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা এবং আগাম প্রস্তুতি ক্ষয়ক্ষতি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ভোরের আকাশ/জেআ