সংবাদপত্রে মোড়ানো খাবার কতটা নিরাপদ?

সকালের নাস্তায় গরম-গরম পরোটা-সিঙাড়া, বিকালের আড্ডায় চপ-পিঁয়াজু কিংবা পুরি—আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষেরই অত্যন্ত প্রিয় খাবার। তবে এই মুখরোচক খাবারগুলো যখন দোকান থেকে খবরের কাগজ বা নিউজপ্রিন্টে মুড়িয়ে দেওয়া হয়, তখনই তৈরি হয় আসল বিপদ। আপাতদৃষ্টিতে একে সাধারণ বা ঐতিহ্যগত অভ্যাস মনে হলেও, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা একে এক ধরণের 'ধীরগতির বিষ' বা স্লো পয়জনিং বলে আখ্যা দিয়েছেন।
খবরের কাগজের কালিতে থাকা রাসায়নিক উপাদান যখন গরম খাবারের সংস্পর্শে আসে, তখন তা সরাসরি আমাদের শরীরে প্রবেশ করে। এর ফলে শরীরে কী কী মারাত্মক ক্ষতি হয়, তা নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
১. শরীরে বিষাক্ত রাসায়নিকের প্রবেশ
খবরের কাগজ ছাপানোর জন্য যে কালি ব্যবহার করা হয়, তাতে ক্ষতিকর ডাইস , পিগমেন্ট এবং গ্রাফাইট থাকে। এছাড়া এই কালিতে উচ্চমাত্রায় সীসা এবং ক্যাডমিয়ামের মতো ভারী ধাতু থাকে।
- কী ঘটে: যখন কোনো ধোঁয়া ওঠা গরম বা তৈলাক্ত খাবার খবরের কাগজে রাখা হয়, তখন খাবারের তাপ ও তেলের কারণে কাগজের কালি গলে খুব দ্রুত খাবারের সাথে মিশে যায়। সেই খাবার খাওয়ার মাধ্যমে কালির সমস্ত বিষাক্ত কেমিক্যাল আমাদের পাকস্থলীতে চলে যায়।
২. ক্যানসারের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়
নিউজপ্রিন্টের কালিতে এক ধরণের ক্ষতিকর রাসায়নিক যৌগ থাকে, যার নাম 'অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বন' । বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটির মতে, এই উপাদানটি মানবদেহের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। শরীরে এর নিয়মিত প্রবেশ কোষের স্বাভাবিক গঠন নষ্ট করে ক্যানসারের মতো মরণব্যাধি সৃষ্টি করতে পারে, বিশেষ করে ফুসফুস ও মূত্রথলির ক্যানসার।
৩. হজম প্রক্রিয়ার স্থায়ী ক্ষতি
খবরের কাগজের রাসায়নিক মিশ্রিত খাবার নিয়মিত খেলে পেটের ভেতরের সংবেদনশীল আস্তরণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদী বদহজম, তীব্র গ্যাস্ট্রিক, আলসার এবং পেটে ব্যথার মতো ক্রনিক সমস্যা দেখা দেয়। শিশুদের ক্ষেত্রে এটি আরও দ্রুত এবং মারাত্মকভাবে লিভার ও কিডনির ক্ষতি করতে পারে।
৪. হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া
কাগজের কালিতে থাকা বিষাক্ত উপাদানগুলো মানবদেহের হরমোন উৎপাদনকারী গ্রন্থিগুলোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এটি শরীরের প্রজনন হরমোনের ভারসাম্য পুরোপুরি নষ্ট করে দিতে পারে। ফলে নারীদের বন্ধ্যাত্ব এবং পুরুষদের প্রজনন ক্ষমতা হ্রাসের মতো জটিল সমস্যা দেখা দেওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
৫. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও বুদ্ধিমত্তা হ্রাস
কালিতে থাকা 'সীসা' বা লেড সরাসরি রক্তের মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছায়। এটি প্রাপ্তবয়স্কদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ধসিয়ে দেয়। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে শিশুরা; সীসার প্রভাবে শিশুদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয় এবং তাদের বুদ্ধিমত্তা বা আইকিউ (IQ) কমে যেতে পারে।
এই স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে আমাদের করণীয়:
- খবরের কাগজ বর্জন করুন: দোকান থেকে খাবার কেনার সময় কখনোই তা খবরের কাগজে নিতে রাজি হবেন না। চপ-সিঙাড়ার অতিরিক্ত তেল মোছার জন্যও এই কাগজ ব্যবহার করবেন না।
- বিকল্প বেছে নিন: খাবার মোড়ানোর জন্য পরিষ্কার কলাপাতা, বাটার পেপার, ফুড-গ্রেড টিস্যু বা অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল পেপার ব্যবহার করার অভ্যাস করুন।
- টিফিন বক্স বা বাটি ব্যবহার: ঘর থেকে বের হওয়ার সময় সাথে একটি ছোট স্টিল বা প্লাস্টিকের টিফিন বক্স রাখা সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। দোকান থেকে খাবার কেনার সময় কাগজের বদলে নিজের বক্সে নিলে তা শতভাগ নিরাপদ থাকে।
বিশেষজ্ঞের শেষ কথা:
সামান্য অসচেতনতা কিংবা অলসতার কারণে নিজের এবং পরিবারের প্রিয়জনদের এমন বড় স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ঠেলে দেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। আজ থেকেই হোটেল বা স্ট্রিট ফুডের দোকানে খবরের কাগজের ব্যবহার বন্ধে নিজে সচেতন হোন এবং অন্যদেরও সচেতন করুন। সুস্থ ও দীর্ঘায়ু পেতে হলে শতভাগ পরিষ্কার ও নিরাপদ পাত্রে খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
ভোরের আকাশ/জেআ