প্রচণ্ড গরমে ঘর ঠান্ডা রাখার সহজ কৌশল

জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ়ের এই তীব্র দাপদাহ আর ভ্যাপসা গরমে জনজীবন ওষ্ঠাগত। ঘরের ভেতর ঢুকলেও স্বস্তি পাওয়ার উপায় থাকে না অনেক সময়। এই অস্বস্তিকর গরমে ঘর ঠান্ডা রাখার জন্য অনেকের প্রথম পছন্দ এয়ার কন্ডিশনার বা এসি (AC)। তবে সবার ঘরে এসি থাকার সুযোগ যেমন থাকে না, তেমনি অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল এবং পরিবেশের ক্ষতির কথাও মাথায় রাখতে হয়।
চিন্তার কিছু নেই, এসি ছাড়াও বেশ কিছু সাধারণ ও প্রাকৃতিক কৌশল কাজে লাগিয়ে আপনি আপনার ঘরকে চমৎকার ঠান্ডা ও আরামদায়ক করে তুলতে পারেন। আসুন জেনে নিই সেই সহজ উপায়গুলো:
১. জানালার কাচ ও পর্দা ব্যবহারের সঠিক নিয়ম
দিনের বেলা যখন রোদের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি থাকে (সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা), তখন ঘরের জানালা এবং ভারী পর্দা বন্ধ রাখুন।
- কেন জরুরি: ঘরের ভেতরের গরম বাতাসের প্রায় ৩০ শতাংশ আসে জানালা দিয়ে। বাইরে থেকে আসা কড়া রোদ ও গরম বাতাস আটকে দিলে ঘরের তাপমাত্রা এমনিতেই বেশ কয়েক ডিগ্রি কমে যায়। রোদ পড়ে গেলে অর্থাৎ বিকালের পর জানালা খুলে দিন, যাতে ঠান্ডা হাওয়া ঘরে ঢুকতে পারে।
২. বরফ ও ফ্যানের যুগলবন্দী (আইস ট্রিক)
এসি ছাড়াই এসির মতো ঠান্ডা হাওয়া পাওয়ার এটি একটি দুর্দান্ত ঘরোয়া ট্রিক। একটি বড় ছড়ানো বাটিতে বা গামলায় বেশ কিছু বরফের টুকরো বা বরফ জল নিন। এবার বাটিটি আপনার টেবিল ফ্যান বা স্ট্যান্ড ফ্যানের ঠিক সামনে রাখুন।
- ফলাফল: ফ্যানের বাতাস যখন বরফের ওপর দিয়ে আপনার দিকে আসবে, তখন বরফ গলে তৈরি হওয়া ঠান্ডা বাষ্প পুরো ঘরে ছড়িয়ে পড়বে এবং ঘর দ্রুত শীতল হবে।
৩. ক্রস-ভেন্টিলেশন বা বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা
বিকেলের পর বা রাতে ঘরের বিপরীতমুখী দুটি জানালা বা দরজা একসাথে খুলে দিন। একদিকের জানালা দিয়ে ঠান্ডা বাতাস ভেতরে ঢুকবে এবং অন্যদিকের জানালা দিয়ে ভেতরের গরম বাতাস বাইরে বেরিয়ে যাবে। একে ক্রস-ভেন্টিলেশন বলা হয়, যা ঘরকে দ্রুত ঠান্ডা করতে দারুণ কার্যকর।
৪. সুতির হালকা চাদর ও পর্দা ব্যবহার
গ্রীষ্মের এই সময়ে ঘরের বিছানায় সিল্ক, পলিয়েস্টার বা জর্জেটের চাদর একদম ব্যবহার করবেন না। বিছানায় সবসময় হালকা রঙের (যেমন- সাদা, হালকা নীল বা অফ-হোয়াইট) সুতির চাদর ব্যবহার করুন। হালকা রঙের সুতি কাপড় তাপ শোষণ করে না, বরং তা প্রতিফলিত করে ঘরকে ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে।
৫. ঘরের ভেতর গাছ রাখুন (ইনডোর প্ল্যান্টস)
ঘরের কোণে বা জানালার পাশে ইনডোর প্ল্যান্টস বা অন্দরমহলের গাছ রাখলে তা ঘরের তাপমাত্রা কমাতে ম্যাজিকের মতো কাজ করে। অ্যালোভেরা, স্নেক প্ল্যান্ট, মানিপ্ল্যান্ট, পিস লিলি বা ফার্ন জাতীয় গাছ বাতাস থেকে গরম উপাদান শুষে নেয় এবং প্রস্বেদন (Transpiration) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঘরের বাতাসে আর্দ্রতা ও অক্সিজেন ছড়িয়ে দেয়, যা ঘরকে প্রাকৃতিকভাবে শীতল রাখে।
৬. মেঝে ভেজা কাপড় দিয়ে মোছা
দুপুরের দিকে বা বিকেলের শুরুতে ঘরের মেঝে জল দিয়ে ভালো করে মুছে নিন। মেঝে মোছার পর ফ্যান ছেড়ে দিলে জল বাষ্পীভূত হওয়ার সময় ঘরের ভেতরের তাপ শুষে নেয়। ফলে ঘরের গুমোট ভাব নিমেষেই কেটে যায়।
৭. বৈদ্যুতিক বাতি ও অ্যাপ্লায়েন্স বন্ধ রাখা
সব ধরণের বৈদ্যুতিক বাতি, বিশেষ করে পুরোনো দিনের হলুদ ইনক্যান্ডিসেন্ট বাল্ব প্রচুর তাপ উৎপন্ন করে। তাই ঘরে সিএফএল বা এলইডি (LED) বাতি ব্যবহার করুন। এছাড়া অপ্রয়োজনে টিভি, কম্পিউটার বা রান্নাঘরের ওভেন চালু রাখবেন না, কারণ এগুলো থেকেও ঘর গরম করার মতো তাপ নির্গত হয়।
৮. একজস্ট ফ্যান (Exhaust Fan) ব্যবহার
রান্নাঘর এবং বাথরুমে অবশ্যই একজস্ট ফ্যান ব্যবহার করুন। রান্না করার সময় রান্নাঘরের ফ্যানটি চালু রাখলে ভেতরের সব গরম হাওয়া ও ভাপ বাইরে চলে যায়, যার ফলে সেই গরম পুরো বাড়িতে ছড়াতে পারে না।
৯. সুতি ভেজা পর্দা টাঙানো
যদি ঘরের জানালা দিয়ে দুপুরের দিকেও বাতাস আসে এবং সেই বাতাস খুব গরম হয়, তবে জানালার পর্দায় কিছুটা জল স্প্রে করে হালকা ভিজিয়ে দিতে পারেন। বাইরে থেকে আসা গরম বাতাস ওই ভেজা পর্দার সংস্পর্শে এসে ঠান্ডা হয়ে ঘরে ঢুকবে।
১০. ছাদ ও জানালার শেড ঠান্ডা রাখা
আপনার ঘরটি যদি একদম ওপরের তলায় (Top Floor) হয়, তবে দুপুরের রোদ সরাসরি ছাদে পড়ার কারণে ঘর প্রচণ্ড গরম হয়। সম্ভব হলে ছাদের ওপর চটের বস্তা বিছিয়ে তাতে জল দিয়ে ভিজিয়ে রাখতে পারেন। এছাড়া জানালার বাইরে বাঁশের তৈরি চট বা শেড ব্যবহার করলে সরাসরি রোদ ঘরের কাচে লাগতে পারে না।
শেষ কথা:
গ্রীষ্মের এই সময়ে ঘর ঠান্ডা রাখার পাশাপাশি নিজের শরীরকে ঠান্ডা রাখাও জরুরি। তাই সুতির ঢিলেঢালা পোশাক পরুন, ক্যাফেইন বা চা-কফি পানের পরিমাণ কমিয়ে প্রচুর পরিমাণে জল, ডাবের জল ও রসালো ফল খান। এসি ছাড়াই প্রকৃতির নিয়ম মেনে একটু সচেতন হলেই এই গ্রীষ্মকাল কাটবে আরামদায়ক ও চমৎকার!
ভোরের আকাশ/জেআ