এক হাঁড়ি কুলফি মালাই

শহরের ব্যস্ত রাস্তায় প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের ভিড়। কর্মব্যস্ত এই নগরে সবাই ছুটছে নিজ নিজ গন্তব্যে। সেই ভিড়ের মাঝেই ধীর পায়ে এগিয়ে চলেন একজন মানুষ। তাঁর হাতে একটি পুরনো সাইকেল। সাইকেলের পেছনের ক্যারিয়ারে লাল কাপড়ে মোড়ানো বড় একটি মাটির পাতিল। পাতিলের ভেতরে বরফ-শীতল পানিতে সাজানো থাকে ঠাণ্ডা কুলফি মালাই—যা অনেকের কাছে শুধু একটি খাবার নয়, বরং শৈশবের এক মিষ্টি স্মৃতি।
দুপুরের রোদ যখন অসহনীয় হয়ে ওঠে, তখন রাস্তায় ভেসে আসে তাঁর পরিচিত ডাক। স্কুল ছুটির পর শিশুদের কৌতূহলী চোখ, অফিসফেরত ক্লান্ত মানুষের সামান্য স্বস্তি কিংবা পথচারীদের ক্ষণিকের বিরতি—সবকিছুর সঙ্গেই জড়িয়ে আছে এই কুলফিওয়ালার উপস্থিতি।
প্রতিদিন সকালেই তিনি ঘর থেকে বের হন নতুন আশায়। শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ঘুরে বেড়ান কুলফি বিক্রির উদ্দেশ্যে। বিক্রি ভালো হলে দিনের শেষে পরিবারের মুখে হাসি ফোটে, আর বিক্রি কম হলে পরদিনের চিন্তা সঙ্গে নিয়েই বাড়ি ফিরতে হয়।
তবে কুলফি বিক্রি এখন আর আগের মতো সহজ নয়। আধুনিক আইসক্রিম, ব্র্যান্ডেড ডেজার্ট ও ফাস্টফুডের ভিড়ে ঐতিহ্যবাহী কুলফির কদর কিছুটা কমেছে। তবুও স্বাদ, ঐতিহ্য ও ক্রেতাদের ভালোবাসার ওপর ভর করেই টিকে আছেন এই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পথের এই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা নগর অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তারা অল্প পুঁজিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেন, একই সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী খাবারের সংস্কৃতিকেও জীবিত রাখেন। প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিতকরণ এবং ক্ষুদ্র ঋণের সুযোগ পেলে তাদের জীবনমান আরও উন্নত হতে পারে।
অনেক ক্রেতার কাছে কুলফি মালাই শুধু গরমে স্বস্তি দেওয়া একটি ঠাণ্ডা খাবার নয়; এটি শৈশব, স্মৃতি ও সহজ-সরল জীবনের প্রতীক। তাই শহরের ব্যস্ততা যতই বাড়ুক, পুরনো সাইকেলে করে কুলফি বিক্রি করা এই মানুষটির পথচলা যেন নগরের মানবিক গল্পেরই এক নীরব অধ্যায়।
প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক শহরের কোলাহলের মাঝেও তাঁর মতো মানুষরা মনে করিয়ে দেন—পরিশ্রম, সততা এবং ছোট ছোট স্বপ্নই জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি। আর সেই শক্তির প্রতীক হয়ে প্রতিদিন শহরের রাস্তায় ঘুরে বেড়ায় এক হাঁড়ি ঠাণ্ডা কুলফি মালাই, যা শুধু তৃষ্ণাই মেটায় না, ফিরিয়ে আনে হারিয়ে যাওয়া শৈশবের স্বাদও।
ভোরের আকাশ/জেআ