গুলশান-বনানী লেক রক্ষায় সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ

রাজধানীর গুলশান, বনানী, বারিধারা ও নিকেতন এলাকার পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা এবং আধুনিক পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দীর্ঘদিনের বিভিন্ন অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করে আন্তর্জাতিক মানের স্যুয়ারেজ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), ঢাকা ওয়াসা, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমন্বয়ে একটি বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে যেসব ভবনে অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী সেপটিক ট্যাংক ও সোক ওয়েল নেই, সেসব ভবনের মালিকদের দ্রুত সময়ের মধ্যে তা স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হবে।
রাজউকের সাম্প্রতিক এক মাঠপর্যায়ের জরিপে দেখা গেছে, গুলশান, বনানী, বারিধারা ও নিকেতন এলাকায় মোট ৪ হাজার ৪০৯টি ভবনের মধ্যে ১ হাজার ৫৪০টিতে সচল সেপটিক ট্যাংক রয়েছে। অন্যদিকে ১ হাজার ৮২২টি ভবনে সেপটিক ট্যাংক নেই এবং ১ হাজার ৪৭টি ভবনের পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা সরাসরি ওয়াসার লাইনের সঙ্গে সংযুক্ত। ফলে অপরিশোধিত বর্জ্যের একটি অংশ লেক ও খালের পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় সরকার দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
জানা গেছে, রাজউক ইতোমধ্যে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে। স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনায় অনুমোদিত নকশা থাকা সত্ত্বেও যেসব ভবনে সেপটিক ট্যাংক ও সোক ওয়েল নির্মাণ করা হয়নি, সেগুলো দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। ইতোমধ্যে অনেক ভবন মালিক প্রয়োজনীয় কাজ শুরু করেছেন। যৌক্তিক কারণে সময় বৃদ্ধির আবেদন করলে সর্বোচ্চ দুই মাস পর্যন্ত সময় দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে।
মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় বনানী এলাকায় একটি জোনভিত্তিক আধুনিক এসটিপি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন ভবন নির্মাণে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী পাঁচ কাঠা বা তার বেশি জমিতে নির্মিত ভবনের জন্য নিজস্ব এসটিপি স্থাপন বাধ্যতামূলক করার প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় গুলশান, বনানী, বারিধারা ও নিকেতন এলাকার সব স্যুয়ারেজ লাইনকে একটি সমন্বিত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দাশেরকান্দি কেন্দ্রীয় পয়ঃশোধনাগারের সঙ্গে সংযুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে ভবিষ্যতে অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি জলাশয়ে না গিয়ে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে শোধিত হবে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলাধারগুলোর পানি দূষণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
জরিপ চলাকালে আরেকটি বিষয়ও সামনে এসেছে। ঢাকার কিছু এলাকায় কাদামাটির আধিক্যের কারণে প্রচলিত সোক ওয়েল সব ক্ষেত্রে কার্যকর হচ্ছে না। কোথাও কোথাও পানি নিষ্কাশনে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। এ কারণে ভূতত্ত্ববিদ, পরিবেশবিদ ও প্রকৌশলীদের সমন্বয়ে একটি কারিগরি মূল্যায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে স্থানীয় ভূপ্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রযুক্তি নির্বাচন করা যায়।
এর আগে গত মে মাসে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় রাজউক, ঢাকা ওয়াসা, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, গুলশান-বনানী-বারিধারা-নিকেতন সোসাইটি এবং জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। রাজউকের অধীনে ১০টি বিশেষ টিম মাঠপর্যায়ে ভবনগুলোর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, অনুমোদিত নকশা এবং বাস্তব অবস্থা যাচাই করে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রস্তুত করে।
মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, যেসব ভবনে অনুমোদিত নকশা লঙ্ঘন করে অবৈধ পয়ঃসংযোগ দেওয়া হয়েছে, সেগুলো আইন অনুযায়ী বিচ্ছিন্ন করা হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যাতে কোনো ভবন নির্মাণে অনুমোদিত নকশা উপেক্ষা করা না হয়, সেজন্য রাজউকের তদারকি আরও শক্তিশালী করা হবে। এ লক্ষ্যে উচ্চপর্যায়ের একটি মনিটরিং ব্যবস্থাও চালু করা হচ্ছে।
এছাড়া রাজউক, ঢাকা ওয়াসা, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এবং স্থানীয় সোসাইটিগুলোর মধ্যে সমন্বিত ব্যবস্থাপনা জোরদার করতে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে একই প্ল্যাটফর্ম থেকে জলাশয় সংরক্ষণ, পয়ঃবর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশগত মান পর্যবেক্ষণের কাজ পরিচালিত হবে।
সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, রাজধানীর উন্নয়ন এখন কেবল অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং পরিবেশ সংরক্ষণ, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং টেকসই নগর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সেই লক্ষ্যেই আন্তর্জাতিক মানের পয়ঃশোধন ব্যবস্থা, আধুনিক স্যুয়ারেজ নেটওয়ার্ক এবং কঠোর নির্মাণ তদারকিকে একই কাঠামোর আওতায় আনা হচ্ছে।
রাজউকের উন্নয়ন নিয়ন্ত্রক পরিচালক (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রক-১) মো. মনিরুল হক বলেন, মাঠপর্যায়ের জরিপের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা সুপারিশ সরকারপ্রধানের কাছে উপস্থাপন করা হবে। অনুমোদনের পর ধাপে ধাপে সব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হবে। সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বয়ে রাজধানীর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাকে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব রূপ দেওয়ার কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে গুলশান-বনানী এলাকার লেক ও খালের পানির মান উন্নত হবে, জলজ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা পাবে এবং নগরবাসী একটি পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশের সুফল ভোগ করবে। একই সঙ্গে রাজধানীতে ভবিষ্যৎ নগর পরিকল্পনায় পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণের একটি কার্যকর দৃষ্টান্তও প্রতিষ্ঠিত হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিতব্য উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে জরিপ প্রতিবেদন, এসটিপি (সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) বাস্তবায়ন এবং আধুনিক স্যুয়ারেজ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়। বৈঠকের সিদ্ধান্তের পর রাজউক ও ঢাকা ওয়াসা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন কার্যক্রম শুরু করবে।
ভোরের আকাশ/এম