লোডশেডিংয়ে বরফ সংকট
পাথরঘাটায় অর্ধেক দামে ইলিশ, লোকসানে জেলেরা

বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে সাগর থেকে মাছ ধরে ঘাটে ফিরেছেন জেলেরা। তবে ঘাটে ফিরেই নতুন সংকটে পড়েছেন তাঁরা। গত দুই দিন ধরে ঘন ঘন লোডশেডিং ও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় বরগুনার পাথরঘাটায় বরফ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
পর্যাপ্ত বরফ না পাওয়ায় সাগর থেকে ধরে আনা ইলিশ সংরক্ষণ করতে পারছেন না জেলেরা। ফলে মাছ পচে যাওয়ার আশঙ্কায় অনেকেই অর্ধেক দামে ইলিশ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে জেলে, ট্রলার মালিক ও মাছ ব্যবসায়ীদের মধ্যে লোকসানের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) দেশের অন্যতম বৃহৎ মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র বরগুনার পাথরঘাটা বিএফডিসি মৎস্য পাইকারি বাজারে গিয়ে এমন চিত্র দেখা গেছে।
জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে নদী ও সাগরে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ মাছ পাওয়া যাচ্ছিল না। এর মধ্যে গত দুই দিন ধরে বৈরী আবহাওয়া বিরাজ করছে। আবহাওয়ার ঝুঁকি নিয়েই কিছু ট্রলার সাগরে মাছ ধরতে যায়। পরে কিছু ইলিশ নিয়ে ঘাটে ফিরলেও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে পর্যাপ্ত বরফ না পাওয়ায় মাছ সংরক্ষণে সমস্যায় পড়েছেন তাঁরা।
জেলেরা জানান, সাগর থেকে মাছ ধরে ঘাটে ফিরলেও বরফের সংকটের কারণে মাছ বেশি সময় রাখা যাচ্ছে না। ফলে মাছ পচে যাওয়ার আশঙ্কায় দ্রুত কম দামে বিক্রি করে দিতে হচ্ছে। এতে সাগরে যাওয়ার জ্বালানি খরচ, শ্রমিকের মজুরি ও অন্যান্য ব্যয়ও অনেক ক্ষেত্রে উঠছে না।
স্থানীয় মাছ ব্যবসায়ীরা জানান, মাত্র এক সপ্তাহ আগেও ভালো মানের ইলিশ প্রতি মণ প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। অথচ গত দুই দিন ধরে একই ধরনের ইলিশ প্রায় ৬০ হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাছ নিয়ে ঘাটে বসে থাকলেও কাঙ্ক্ষিত ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না।
পাইকারদের ভাষ্য, দীর্ঘ সময় বরফ ছাড়া থাকলে মাছের মান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে তাঁরা মাছ কেনার ক্ষেত্রে ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। ফলে বাজারে ইলিশের দাম আরও কমে যাচ্ছে।
জেলে রহিম বলেন, ‘আবহাওয়া খারাপের মধ্যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাছ শিকার করে ঘাটে এসেছি। কিন্তু মাছের দাম এত কম যে জ্বালানি খরচই উঠছে না। বরফের সংকটের কারণে মাছ ধরে রাখারও সুযোগ নেই।’
বরফের সংকটের পাশাপাশি এর দাম বেড়ে যাওয়ার অভিযোগও করেছেন জেলেরা। তাঁদের দাবি, স্বাভাবিক সময়ে যে বরফ প্রায় ২২০ টাকায় পাওয়া যায়, বিদ্যুৎ সংকটের কারণে সেটিই এখন ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। এতে মাছ সংরক্ষণ করতে গিয়ে জেলে ও ট্রলার মালিকদের অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হচ্ছে।
বরগুনা ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, ‘একদিকে বিদ্যুৎ থাকছে না, অন্যদিকে বরফের দাম বেড়ে গেছে। ২২০ টাকার বরফ ৬০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। মাছের দাম কম, জ্বালানি খরচ বেশি—সব মিলিয়ে ট্রলার মালিক ও জেলেরা লোকসানের মধ্যে পড়ছেন।’
তবে বরফকল মালিক মাসুম কোম্পানি বলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় বরফ উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা যাচ্ছে না। এতে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। এ কারণে কিছুটা বাড়তি দাম নেওয়া হচ্ছে। তবে প্রতি ক্যান বরফ ৬০০ টাকা করে বিক্রি করার বিষয়টি তাঁর জানা নেই।
জেলেদের পাশাপাশি জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে ট্রলার মালিকদের ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। মাছের দরপতন, বরফের বাড়তি দাম ও জ্বালানি খরচ—সব মিলিয়ে সাগরে মাছ শিকারে গিয়ে কাঙ্ক্ষিত আয় করতে পারছেন না তাঁরা। এতে পাথরঘাটার মৎস্য খাতে বড় ধরনের লোকসানের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পাথরঘাটায় তীব্র লোডশেডিংয়ের বিষয়টি স্বীকার করেছেন পাথরঘাটা বিদ্যুৎ অফিসের ডিজিএম আরিফ শাহরিয়ার ফাহাদ। তিনি বলেন, ‘ভান্ডারিয়া থেকে পাথরঘাটা উপজেলা পর্যন্ত প্রায় ৬৫ কিলোমিটার দীর্ঘ বিদ্যুৎলাইন রয়েছে। এই দীর্ঘ লাইনের কোথাও সমস্যা হলে পুরো লাইন বন্ধ হয়ে যায়। তবে সমস্যা সমাধানে কাজ চলছে। বরগুনা থেকে নতুন লাইন এলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।’
জেলেদের দাবি, দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করার পাশাপাশি বরফের বাজারে নজরদারি বাড়াতে হবে। অতিরিক্ত দামে বরফ বিক্রির অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বৈরী আবহাওয়া, মাছের দরপতন, জ্বালানি খরচের চাপ এবং বিদ্যুৎ ও বরফ সংকট একসঙ্গে চলতে থাকলে পাথরঘাটার উপকূলীয় মৎস্য খাত আরও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
ভোরের আকাশ/সু.পা