প্রকৃতির সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রেখেই সুবলং ঝর্ণার পর্যটন উন্নয়নের দাবি

বর্ষা নামলেই পাহাড়ের বুক বেয়ে নেমে আসে সাদা জলধারা। কাপ্তাই হ্রদের নীল জলরাশি, সবুজ পাহাড় আর ঝরনার কলকল শব্দে রাঙামাটির সুবলং হয়ে ওঠে প্রকৃতিপ্রেমীদের অন্যতম আকর্ষণ। প্রায় ৩০০ ফুট ওপর থেকে নেমে আসা এই ঝরনা দেখতে প্রতিদিনই ছুটে আসছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পর্যটক। তবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পর্যটন ব্যবস্থাপনা গড়ে না ওঠায় নিরাপত্তা, অবকাঠামো, শৃঙ্খলা ও পরিবেশ নিয়ে নানা সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে।
রাঙামাটি শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে বরকল উপজেলার সুবলং ঝর্ণা। সড়কপথে সরাসরি সেখানে যাওয়ার সুযোগ নেই। শহরের বিভিন্ন ঘাট থেকে নৌযান বা স্পিডবোটে কাপ্তাই হ্রদের বিস্তীর্ণ জলরাশি পেরিয়ে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে পৌঁছাতে হয় ঝর্ণার কাছে। হ্রদের নীল জল আর পাহাড়ের সবুজের মাঝ দিয়ে এই নৌযাত্রাও পর্যটকদের ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ।
বর্ষা এলে বদলে যায় সুবলংয়ের চেহারা। পাহাড়ের বুক থেকে নেমে আসা স্বচ্ছ জলধারা কয়েক ধাপে নিচে গড়িয়ে কাপ্তাই হ্রদের জলে মিশে যায়। ঝরনার কলকল শব্দ, মেঘে ঢাকা পাহাড় আর হ্রদের জলরাশি মিলে তৈরি করে এক মায়াবী পরিবেশ। পানির প্রবাহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে পর্যটকদের আনাগোনাও।
তবে ঝর্ণার সৌন্দর্য উপভোগ করতে এসে পর্যটকদের সামনে উঠে আসছে ব্যবস্থাপনার নানা প্রশ্ন। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা না থাকা, ঝর্ণার দুই পাশে পরিকল্পিত চলাচলের পথের সীমাবদ্ধতা, নারী ও শিশুদের জন্য আলাদা নিরাপদ স্থান না থাকা, বিশ্রাম ও প্রয়োজনীয় পর্যটনসেবার ঘাটতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে অসন্তোষ জানিয়েছেন অনেকে।
বগুড়া থেকে আসা কয়েকজন পর্যটক বলেন, সুবলংয়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রেখেই ঝর্ণার দুই পাশে পরিকল্পিত ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা প্রয়োজন। এতে ঝুঁকি কমিয়ে পর্যটকেরা ঝর্ণার বিভিন্ন অংশের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন। পাশাপাশি নারী ও শিশুদের জন্য নিরাপদ স্থান নির্ধারণ, পর্যটকদের চলাচলে শৃঙ্খলা এবং সার্বিক নিরাপত্তা জোরদার করা দরকার।
তাদের মতে, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই হবে না। ঝর্ণা, পাহাড় ও হ্রদের নিজস্ব ইকোসিস্টেম বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও ব্যবস্থাপনা করতে হবে। অপরিকল্পিত স্থাপনা কিংবা অতিরিক্ত পর্যটনচাপ যাতে প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট না করে, সেদিকেও নজর দেওয়া জরুরি।
ফেনী থেকে আসা পর্যটক জয়নাল আবেদীন বলেন, কয়েক বছর আগে সুবলংয়ে এসে যে চিত্র দেখেছিলেন, এক দশক পরও প্রায় একই অবস্থাই দেখছেন। তিনি বলেন, “শুধু ইজারা দিয়ে টাকা কামালেই হবে না। অপার সম্ভাবনাময় সুবলং ঝর্ণাকে প্রকৃত অর্থেই পর্যটকবান্ধব করে গড়ে তুলতে হবে।”
স্থানীয় পর্যটনসংশ্লিষ্টদের মতে, সুবলংকে ঘিরে শুধু একটি দর্শনীয় স্থান নয়, বড় ধরনের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও রয়েছে। পর্যটকদের যাতায়াতকে কেন্দ্র করে নৌযান, খাবার, স্থানীয় পণ্য ও ক্ষুদ্র ব্যবসার সুযোগ তৈরি হয়েছে। পরিকল্পিত পর্যটন ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠলে এসব খাতে কর্মসংস্থান ও স্থানীয় আয় আরও বাড়তে পারে।
একই সঙ্গে প্রবেশব্যবস্থা, নৌযান পরিচালনা, স্থানীয় পণ্য বিপণনসহ পর্যটনসেবাগুলোকে সুশৃঙ্খল করা গেলে সরকারি রাজস্ব আয়ের সুযোগও বাড়বে। তবে এ উন্নয়ন পরিকল্পনায় স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও পরিবেশের স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
কারণ সুবলংয়ের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য। পাহাড় কেটে কিংবা অতিরিক্ত কংক্রিটের স্থাপনা তৈরি করে ঝর্ণার স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট করা হলে শেষ পর্যন্ত হারিয়ে যেতে পারে এর মূল আকর্ষণ। তাই প্রয়োজন পরিবেশবান্ধব ওয়াকওয়ে, নিরাপদ সিঁড়ি, পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পর্যটক নিরাপত্তার সমন্বিত পরিকল্পনা।
বর্ষায় পাহাড়ের বুক থেকে নেমে আসা সাদা জলধারা যখন কাপ্তাই হ্রদের নীল জলে মিশে যায়, তখন সুবলং যেন প্রকৃতির আঁকা এক জলছবি। সেই জলছবির প্রতি মানুষের আকর্ষণ যেমন আছে, তেমনি রয়েছে পর্যটন ও স্থানীয় অর্থনীতির সম্ভাবনাও। এখন প্রয়োজন পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো।
প্রকৃতির সৌন্দর্যকে পুঁজি করে শুধু ইজারা ও রাজস্ব আদায় নয়—সুবলংকে নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন, পরিবেশবান্ধব ও পর্যটকবান্ধব করে গড়ে তোলাই হতে পারে এই নৈসর্গিক এলাকার টেকসই পর্যটন উন্নয়নের পথ।
ভোরের আকাশ/সু.পা