উখিয়ায় অস্থায়ী গরুর বাজার ইজারা নিয়ে চরম উত্তেজনা

কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নে অস্থায়ী গরুর বাজার ইজারা নিয়ে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। ‘মরাগাছতলা’ বাজারের নামে ইজারা নেওয়ার পর প্রায় ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার দূরের তেলখোলা এলাকায় গিয়ে গরু প্রতি ১ হাজার ৫০০ টাকা করে হাসিল আদায়ের অভিযোগ উঠেছে ইজারাদার পক্ষের বিরুদ্ধে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ঘটনাটি ঘটে বুধবার (২০ মে) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ইজারা ডাক নেয়ার ২ ঘণ্টা মধ্যে এ ঘটনা ঘটে।
২০১৭ সালে ব্যাপকভাবে রোহিঙ্গা আগমনের ফলে রাজাপালং ও পালংখালী ইউনিয়নের ৬টি রোহিঙ্গা অধ্যুষিত বাজার যথাক্রমে জামতলী শফিউল্লাহ কাটা (রোহিঙ্গা ভিক্তিক বাজার) তাজিমার খোলা কাঠাল তলা, (রোহিঙ্গা ক্যাম্প ভিক্তিক বাজার), ময়নারঘোনা (রোহিঙ্গাক্যাম্প ভিক্তিক বাজার), লাম্বাশিয়া (রোহিঙ্গা ক্যাম্প ভিক্তিক বাজার), কুতুপালং নৌকার মাঠ (রোহিঙ্গা ক্যাম্প ভিক্তিক বাজার) ও মুছড়া উঠনী (রোহিঙ্গা ক্যাম্প ভিক্তিক বাজার) বসিয়ে কোরবানি গরু বিক্রির অস্থায়ী হাট বসানো হতো। তখন রাজস্ব আদায় হতো ৮থেকে ১০ লাখ টাকার মতো। তখন রোহিঙ্গার সংখ্যা ছিল ১০ থেকে ১১ লাখ, এখন রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১৮ লাখ। জনসংখ্যা অনুপাতে ও দূরত্ব বিবেচনা করে অস্থায়ী কোরবানির গরুর হাট বসানোর কথা ছিল ১০ থেকে ১২টা।
স্থানীয়রা বলেন, তখন রোহিঙ্গারা ছিল হতদরিদ্র আর এখন তারা অধিকাংশই সচ্ছল। ব্যবসা বাণিজ্য, জিও, এনজিওর পৃষ্ঠপোষকতা, ইয়াবা, মানবপাচার, ও কালোবাজারি করে তারা এখন ধনেজনে ভরপুর। সুতরাং অনেকেই ক্যাম্পে না থেকে উখিয়া-টেকনাফ, কক্সবাজার শহর ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ভাড়া বাসা বা নিজস্ব বাড়ির মালিক এক কথায় বেশীরভাগ রোহিঙ্গা দ্বৈতবাড়িতে থাকে।
এ ঘটনা খোলাখুলিভাবে প্রশাসন থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদ ও জনপ্রতিনিধি সবাই জানে। তারপর ও সরকারি সুযোগ সুবিধা জিও এনজিওর সাহায্য তারাই পায়। পায় না সেখানকার স্থানীয়রা। বিদেশি দাতা সংস্থা ও কোরবানির সময় তাদের পর্যাপ্ত সহযোগিতা করে। ফলে পূর্বের চাইতে কোরবানির গরুর চাহিদা বেড়েছে ১০ গুণ। তাই বাজার সংখ্যা বাড়ানো উচিত ছিল। বর্তমানে সব বাজার বিলুপ্ত ঘোষণা করে বালুখালীর মরাগাছতলা বাজার কে ওরা ৭৫বিএনপি নেতা মিলে ১৫ লক্ষ টাকার বাজার ৩০ হাজার টাকায় ডেকে নিয়েছেন। এতে করে সরকার হারালো লক্ষ লক্ষ টাকার রাজস্ব। লাভবান হলেন বিএনপির কিছু নেতাকর্মী।
পালংখালীর ইউনিয়নের মরাগাছতলা অস্থায়ী গরুর বাজার মাত্র ৩০ হাজার টাকায় ইজারা দেওয়া হয় বিএনপি নেতা রশিদ আহমেদ চৌধুরীর নামে। অভিযোগ রয়েছে, উপজেলা বিএনপির সভাপতি সরওয়ার জাহান চৌধুরীর হস্তক্ষেপে ৭৫ জন নেতাকর্মীর সমন্বয়ে এই ইজারা প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। তবে ইজারা নেওয়ার দুই ঘণ্টার মধ্যেই তেলখোলা এলাকায় গিয়ে গরুর ক্রেতা-বিক্রেতাদের কাছ থেকে হাসিল আদায় শুরু করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতি গরু থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা করে আদায় করা হয়। অবশ্য গত ১০ বছর ধরে মরাগাছ তলাসহ পার্শ্ববর্তী ৬টি বাজার ১৫ লক্ষ টাকার ইজারায় ডাক উঠে। কখনো কখনো খাসকালেশন করা হতো তখনও ১০ লাখ টাকার রাজস্ব সরকারি কোষাগারে জমা হতো। সব নিয়ম ভেঙ্গে এ বছর মাত্র ৩০ হাজার টাকায় ডাক তুলে ৭৫ জন বিএনপি নেতাকর্মীদের মাঝে শেয়ারভাগ করে দেন।উপজেলা বিএনপির সভাপতি সরওয়ার জাহান চৌধুরী।
এ বিষয়ে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দীন চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন, তেলখোলায় কোনো বাজারের ডাক দেওয়া হয়নি। তাহলে ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে গিয়ে ইজারার নামে জোরপূর্বক অন্যায়ভাবে টাকা আদায় করা হচ্ছে। এটা অন্যায় ও ক্ষমতার অপব্যবহার নয়কি! এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করার পরামর্শ দিয়েছি।
চেয়ারম্যানের এমন বক্তব্যের পর স্থানীয় বিএনপির দুই সাবেক ইউপি সদস্য নুরুল আমিন ও জয়নাল আবেদীন তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এ ঘটনার পর এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আনলে যেকোনো সময় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটতে পারে। বিএনপির প্রবীণ নেতা নুরুল আলম, যার নেতৃত্বে বাজারটির ইজারা সম্পন্ন হয়েছে বলে জানা গেছে। তিনি বলেন, দলীয় নেতাকর্মীদের কিছু আর্থিক সুবিধা দিতে মরাগাছতলা বাজারটি রশিদ আহমেদ চৌধুরীর নামে ইজারা নেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য রশিদ আহমেদ চৌধুরী ইউপি চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দীন চৌধুরীর চাচা।
বিএনপির এ নেতা বলেন, কেউ যদি সীমা লঙ্ঘন করে অন্য এলাকায় গিয়ে হাসিল আদায় করে, তাহলে তার দায় সবাইকে নিতে হবে। তেলখোলা থেকে আর হাসিল তোলা হবে না। তবে তার এই বক্তব্যে ইজারার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অধিকাংশ সদস্য একমত নন বলে জানা গেছে। ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। ফলে সংঘাত সংঘর্ষের আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
এ বিষয়ে ইউপি চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দীন চৌধুরী আরও বলেন, রোহিঙ্গা অধ্যুষিত পালংখালীর মরাগাছতলাসহ ৬টি বাজার আগে প্রায় ৮/১০ লাখ টাকায় ইজারা দেওয়া হতো। এতে সরকার উল্লেখযোগ্য রাজস্ব পেত। কখনো খাস কালেকশন হলেও ১০ লাখ টাকার বেশি রাজস্ব আদায় হতো। সেখানে এবার মাত্র ৩০ হাজার টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে। এতে সরকার বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ইজারার আড়ালে চাঁদাবাজি করা হলে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিশেষ করে দুর্গম ও রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকায় জোরপূর্বক হাসিল আদায়ের অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
চেয়ারম্যান আরও দাবি করেন, দূরদূরান্তের বাজার থেকে গরু কিনে ট্রাকে পরিবহনের সময়ও সড়কে গাড়ি থামিয়ে ইজারাদারের লোকজন চাঁদা আদায় করছে। এতে একই গরুর জন্য ক্রেতাদের একাধিকবার হাসিল দিতে গিয়ে নানা ভাবে হয়রানীর শিকার হচ্ছে ব্যবসায়ীরা।
এ ব্যাপারে উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিফাত আসমার সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে ২১ মে এ প্রতিবেদককে বলেন, সর্বচ্চো ডাককারীকে ইজারা দেয়া হয়েছে। তবে এদের সীমানা মরাগাছতলা পর্যন্ত, তেলখোলা গিয়ে গরুর ইজারা নেয়ার অভিযোগ সম্পর্কে তিনি অবগত হয়েছেন। এটা অন্যায় আবার যারা ইজারা ছাড়া বাজারে গরু কেনাকাটা করছে তাও অন্যায়। বাজারের সংখ্যা কমলো কেন এ প্রশ্নের উত্তর তিনি কৌশলে এড়িয়ে যান।
ভোরের আকাশ/ইউএম