উখিয়ায় বাংলাদেশিদের লক্ষ্য করে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের গুলিবর্ষণ : স্থানীয় যুবক গুরুতর আহত

কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতরে জুমার নামাজ শেষে বের হওয়ার সময় এক বাংলাদেশি যুবককে গুলি করার অভিযোগ উঠেছে রোহিঙ্গা সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে।
জমি নিয়ে বিরোধ, বকেয়া টাকা-পয়সার লেনদেন ও পূর্বশত্রুতার জেরে এ ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।
গুলিতে ওবাইদুল হক লালু (৩০) নামে এক বাংলাদেশি যুবক গুরুতর আহত হয়েছে। বর্তমানে তিনি কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে বলে তার মা সাইরা খাতুন নিশ্চিত করেছেন।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) দুপুর ১টা ৪০ মিনিটের দিকে উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের ১৪ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সি-২ ব্লকে অবস্থিত মসজিদে সুন্নাহর সামনে এ ঘটনা ঘটে।
আহত ওবাইদুল হক লালু পালংখালী ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের চোরখোলা এলাকার আবুল হোছেন প্রকাশ ভুলুর ছেলে। তিনি স্থানীয়ভাবে ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বলে জানা গেছে। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধার করে উখিয়ার কুতুপালং এমএসএফ হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে চিকিৎসকরা উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে পাঠান।
পুলিশ ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জুমার নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় ওবাইদুল হক লালুর সঙ্গে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী ও আরএসও কমান্ডার মোহাম্মদ ইউনুস (৩৫) ও তার সঙ্গে থাকা কয়েকজনের বিরোধ সৃষ্টি হয়। স্থানীয়দের দাবি, ইউনুস নিজেকে আরএসও-সংশ্লিষ্ট কমান্ডার হিসেবে পরিচয় দেন। তাঁর সঙ্গে হেড মাঝি আমানুল্লাহ, সাইট মাঝি সব্বির আহমদ, চাকমা ওসমান, মোহাম্মদ হারুন ও মোহাম্মদ ফারুকসহ কয়েকজন ছিলেন।
একপর্যায়ে অস্ত্রধারী কয়েকজন সন্ত্রাসী ওবাইদুলকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এতে তাঁর ডান পায়ের গোড়ালিতে গুলি লাগে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে প্রায় পাঁচ রাউন্ড গুলির শব্দ শোনা যায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গুলিবর্ষণের পর অস্ত্রধারীরা ক্যাম্পের কাঁটাতারের অংশ অতিক্রম করে বাংলাদেশি বসতিপূর্ণ এলাকায় ঢুকে পড়ে। এতে আশপাশের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
আহত ওবাইদুলের বড় ভাই জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “আমার ভাই মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় হঠাৎ তাকে লক্ষ্য করে গুলি করা হয়। গুলিতে তার পায়ে আঘাত লাগে। পরে স্থানীয় লোকজন তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার চাই।”
স্থানীয় বাসিন্দা মরিয়ম বেগম বলেন, “জুমার নামাজের পর হঠাৎ কয়েক রাউন্ড গুলির শব্দ শুনতে পাই। পরে জানতে পারি, একজন বাংলাদেশি যুবক গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এতে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।”
স্থানীয় বাংলাদেশি নাগরিক সিরাজ মিয়া বলেন, “জুমার নামাজের পর রোহিঙ্গা আরএসও সদস্যরা অস্ত্রসহ এসে হঠাৎ গুলি করতে করতে কাঁটাতার পেরিয়ে বাংলাদেশিদের বাড়ির উঠানে চলে আসে। ঘটনার পর থেকে লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। উখিয়া থানা পুলিশের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে আসায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। ক্যাম্পে এ ধরনের গুলিবর্ষণের ঘটনায় সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।”
স্থানীয় বাসিন্দা নুর আয়েশা বলেন, “গুলির শব্দ শুনে সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। পরে জানতে পারি, আমার প্রতিবেশী লালুকে গুলি করে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা পালিয়ে গেছে। এ সময় লালু গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। আমরা চাই পুলিশ দ্রুত জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনুক। পাশের ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা রাতে আবারও হামলা করার হুমকি দিচ্ছে। আমরা সরকারের কাছে নিরাপত্তা চাই।”
পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, “গুলিবিদ্ধ হয়ে স্থানীয় একজন বাসিন্দা আহত হয়েছেন। ক্যাম্পের ভেতরে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে অবৈধ অস্ত্র ও গুলি উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও কঠোর অভিযান চালানোর দাবী জানাচ্ছি।”
উখিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আরমান আজাদ বলেন, “১৪ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কাঁটাতারের পাশে একটি মসজিদের সামনে স্থানীয় বাংলাদেশি এক দোকানদারকে সশস্ত্র রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা গুলি করেছে। ঘটনায় লালু নামের এক বাংলাদেশি নাগরিক আহত হয়েছেন। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে।
ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন, গুলিবর্ষণে ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধার এবং জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারে পুলিশি কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত ও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।”
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত ৮ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অধিনায়ক (ভারপ্রাপ্ত) রিয়াজ উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, “রোহিঙ্গাদের ছোড়া গুলিতে এক বাংলাদেশি ব্যবসায়ী আহত হয়েছেন। ঘটনার পরপরই নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে এবং ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।”
স্থানীয়দের ভাষ্য ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্যে, কাঁটাতারসংলগ্ন এলাকায় গুলিবর্ষণের ঘটনায় ক্যাম্পের নিরাপত্তা ও স্থানীয় বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ক্যাম্পের ভেতর থেকে অস্ত্র নিয়ে বাংলাদেশি বসতিপূর্ণ এলাকায় প্রবেশের অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন সচেতন মহল।