ভূরুঙ্গামারীতে থামছে না ফসল নষ্টের ঘটনা, জমি বিরোধে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক

কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে জমিজমা নিয়ে বিরোধ ও পূর্বশত্রুতার জেরে ফসল নষ্টের ঘটনা যেন থামছেই না। কখনো বিষাক্ত আগাছানাশক ছিটিয়ে আমন ধান নষ্ট, কখনো রাতের আঁধারে পাওয়ার টিলার দিয়ে ধানক্ষেত তছনছ, আবার কখনো কেটে ফেলা হচ্ছে ফলন্ত সুপারি ও কলাগাছ। এমনকি পুকুরে বিষ প্রয়োগ করে মাছ নিধনের অভিযোগও রয়েছে। এসব ঘটনায় আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি প্রাণনাশের হুমকি, হামলা ও পরিবারের সদস্যদের অবরুদ্ধ করে রাখার অভিযোগ উঠেছে।
চলতি বছরেও উপজেলাটির বিভিন্ন এলাকায় একই ধরনের একাধিক ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও ভুক্তভোগীদের দাবি, অপরাধের ধারাবাহিকতা বন্ধ হচ্ছে না। এসব ঘটনায় কারা জড়িত, তা তদন্তের বিষয়। তবে অভিযোগগুলোর মধ্য দিয়ে কৃষকের ফসল ও সম্পদ রক্ষার পাশাপাশি বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
সর্বশেষ গত ১১ অক্টোবর ভূরুঙ্গামারী উপজেলার পাইকেরছড়া ইউনিয়নের খামার বেলদহ এলাকায় প্রায় তিন একর ৩৬ শতক জমির আমন ধান নষ্ট করার অভিযোগ ওঠে। কৃষক আকিউল হোসেন, আশরাফুল ও হারুন অর রশিদ কাজলের অভিযোগ, রাতের আঁধারে জমিতে আগাছানাশক প্রয়োগ করে ধান নষ্ট করা হয়েছে। এতে তাঁদের প্রায় তিন লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেন তাঁরা। এ ঘটনায় ১৫ অক্টোবর মেহেদী হাসান, হাবিবুর রহমান, মাসুদ রানা ও অন্যদের বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়। ভূরুঙ্গামারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আজিম উদ্দিন অভিযোগ পাওয়ার কথা জানিয়ে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন।
এর আগে ৫ সেপ্টেম্বর উপজেলার তিলাই ইউনিয়নের পশ্চিম ছাট গোপালপুর এলাকায় ২০টি ফলন্ত সুপারি গাছ কেটে ফেলার অভিযোগ ওঠে। গাছের মালিক হেলাল উদ্দিনের দাবি, এতে প্রায় ৪০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। তিনি প্রাণনাশের হুমকি ও জমি দখলের চেষ্টার অভিযোগও করেন। ৬ সেপ্টেম্বর থানায় অভিযোগ দেওয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এবং উভয় পক্ষকে জমির কাগজপত্র দেখাতে বলে। অভিযুক্ত পক্ষের একজন গাছ কাটার অভিযোগ অস্বীকার করেন।
জুলাই মাসেও ফসল নষ্টের অভিযোগ সামনে আসে। উপজেলার আন্দারীঝাড় ইউনিয়নের খামার আন্দারীঝাড় এলাকায় ১২ জুলাই আমন ধানের চারা রোপণের পর রাতের আঁধারে পাওয়ার টিলার দিয়ে সেগুলো নষ্ট করার অভিযোগ করেন কৃষক লিটন মিয়া। তাঁর দাবি, এতে প্রায় ৫০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। একই রাতে আব্দুল মজিদের বাড়ির ফটকে বাইরে থেকে শিকল লাগিয়ে পরিবারের সদস্যদের আটকে রাখা এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও ওঠে। এসব ঘটনায় থানায় দুটি লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়।
এপ্রিল মাসে উপজেলার সদর ইউনিয়নের পশ্চিম ভটহাট এলাকায় কৃষক শরবত আলীর প্রায় চার বিঘা জমির ধানে আগাছানাশক প্রয়োগ করে নষ্ট করার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় তিনি প্রতিবেশী জোয়াদুল আলম ও তাঁর ছেলে মন্নাফ হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। পরদিন থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। তবে মন্নাফ হোসেন অভিযোগ অস্বীকার করে জমির মালিকানা নিয়ে আদালতে মামলা চলার কথা জানান।
এর আগে ৬ জানুয়ারি উপজেলার শিলখুড়ি ইউনিয়নের কাটগিরি পূর্বপাড়া নাসির মোড় এলাকায় ‘আল্লাহর দান মৎস্য খামারে’ বিষ প্রয়োগে মাছ নিধনের অভিযোগ ওঠে। খামারের মালিক লুৎফর রহমান ও জাহাঙ্গীর আলম জাকিরের দাবি, এতে প্রায় পাঁচ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। জমিজমা নিয়ে বিরোধের জেরে এ ঘটনা ঘটেছে বলে তাঁদের ধারণা। এ ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয় এবং পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে।
২০২৫ সালেও উপজেলাটিতে ফসল ও গাছপালা নষ্টের একাধিক অভিযোগ ওঠে। ওই বছরের ২৮ অক্টোবর শিলখুড়ি ইউনিয়নের উত্তর ধলডাঙ্গা ও কালিয়ারচর এলাকায় প্রায় তিন বিঘা জমির ১ হাজার ২০০ কলাগাছ কেটে ফেলার অভিযোগ করেন হাতেম আলী। তাঁর দাবি, এতে পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া পরিবারের সদস্যদের মারধর, হুমকি এবং মোটরসাইকেল, মুঠোফোন ও টাকা নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও করেন তিনি। এ ঘটনায় থানায় অভিযোগ দেওয়া হয়।
এরও আগে ৯ অক্টোবর ভূরুঙ্গামারীতে ট্রাক্টর দিয়ে চাষ করে আট বিঘা জমির রোপা আমন ধান নষ্ট করার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় আব্দুস মান্নান ২৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন বলে জানা গেছে। এ ঘটনাটিও জমিসংক্রান্ত বিরোধের জেরে ঘটেছে বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
২০২৫ সালের ২৬ জানুয়ারি উপজেলার জয়মনিরহাট ইউনিয়নের বড় খাটামারী এলাকায় ৮৫টি সুপারি গাছ ও ৮৫টি কলাগাছ কেটে ফেলার অভিযোগ ওঠে। জমির মালিক আব্দুল মোতালেবের দাবি, এতে প্রায় তিন লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। জমিজমা নিয়ে বিরোধের জেরে এ ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করা হয়। এ ঘটনায় প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দেওয়া হয়।
স্থানীয়দের মতে, জমির মালিকানা ও দখল নিয়ে বিরোধের জেরে ফসল নষ্ট, গাছ কাটা কিংবা মাছ নিধনের মতো ঘটনা কৃষকদের জীবিকা ও আর্থিক নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে। এসব ঘটনায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে পাল্টাপাল্টি মালিকানা দাবি ও অভিযোগও রয়েছে। ফলে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। দ্রুত বিরোধের আইনগত নিষ্পত্তি ও অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে এলাকায় উত্তেজনা বাড়ার পাশাপাশি সংঘর্ষের আশঙ্কাও করছেন স্থানীয়রা।
কৃষকের কাছে জমির ফসল শুধু খাদ্য উৎপাদনের উপকরণ নয়, পরিবারের সারা বছরের আয় ও জীবিকারও বড় ভরসা। ভুক্তভোগী কৃষকেরা প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে ভূরুঙ্গামারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ওমর ফারুক বলেন, জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ ও পারিবারিক কলহের জেরেই মূলত এ ধরনের ফসল নষ্টের ঘটনা ঘটছে। এতে শুধু সংশ্লিষ্ট কৃষকই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না, পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সবাই। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সচেতনতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই।
তিনি আরও বলেন, কোথাও ফসল বিনষ্টের ঘটনা ঘটলে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা সরেজমিন পরিদর্শন করেন। ক্ষয়ক্ষতি পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব না হলেও তা কমিয়ে আনার লক্ষ্যে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হয়। কৃষি বিভাগ থেকে প্রণোদনা হিসেবে সার ও বীজ দেওয়া ছাড়া আর্থিক সহায়তা দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে ক্ষয়ক্ষতির তুলনায় এ সহায়তা খুবই অপ্রতুল। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সুদৃষ্টি দিলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা কিছুটা হলেও ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবেন।
সহকারী পুলিশ সুপার (ভূরুঙ্গামারী সার্কেল) মুনতাসির মামুন বলেন, জমি নিয়ে বিরোধ কিংবা পারিবারিক কলহ, যে কারণেই হোক না কেন, কারও ফসল বা সম্পদ নষ্ট করা গুরুতর অপরাধ। এ ধরনের ঘটনায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই মামলা হয়েছে। অভিযোগ পাওয়ার পর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করে মামলা নেওয়া হয়েছে। আসামিদের গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এখনো কিছু আসামি কারাগারে রয়েছেন এবং বেশ কয়েকটি মামলা আদালতে বিচারাধীন। আদালতের কোনো নির্দেশনা এলে পুলিশ তা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পালন করবে। তিনি আরও বলেন, জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া গেলে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি কমে আসবে বলে আশা করা যায়।
ভোরের আকাশ/ এনউব