সাজেকে পর্যটন ব্যবসা ধসের সঙ্গে বাড়ছে খাদ্যপণ্য, জ্বালানি ও ওষুধ সঙ্কট

একসময় পর্যটকের পদচারণায় মুখর থাকত পাহাড়ের সাজেক। রিসোর্ট-কটেজে অতিথিদের ভিড়, রেস্তোরাঁয় খাবার পরিবেশনের ব্যস্ততা আর পর্যটনকেন্দ্রিক নানা ব্যবসায় ছিল কর্মচাঞ্চল্য। কিন্তু অবরোধে সেই চেনা দৃশ্য এখন অনেকটাই বদলে গেছে।
পর্যটকশূন্য রিসোর্ট-কটেজ, ক্রেতাহীন দোকান আর বন্ধের মুখে থাকা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাড়ছে স্থানীয় মানুষের দুর্ভোগ। পর্যটননির্ভর আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষ। এরই মধ্যে খাদ্যপণ্য, জ্বালানি ও জরুরি ওষুধের সরবরাহ নিয়েও দেখা দিয়েছে উদ্বেগ।
দুর্গম পাহাড়ি জনপদ সাজেকে যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় গুরুতর অসুস্থ রোগী কিংবা দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নেওয়াও কঠিন হয়ে উঠেছে। দীর্ঘস্থায়ী এই অচলাবস্থায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়তে পারেন শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিরা। ফলে সংকটটি এখন শুধু পর্যটন ব্যবসার ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্থানীয় মানুষের খাদ্য, চিকিৎসা ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের প্রশ্ন।
পর্যটক নেই, কর্মচারীদের বেতন দেবে কে?
সাজেকের অর্থনীতির বড় অংশই পর্যটননির্ভর। রিসোর্ট-কটেজ, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, মুদি দোকানসহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু মানুষের কর্মসংস্থান। পর্যটকদের যাতায়াত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানের আয় প্রায় থমকে গেছে। তবে আয় বন্ধ হলেও দোকানভাড়া, প্রতিষ্ঠানের রক্ষণাবেক্ষণ, কর্মচারীদের বেতন ও পারিবারিক ব্যয় বহন করতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের।
সাজেকের রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী আব্দুর রাজ্জাক বলেন, তাঁর রেস্তোরাঁয় আটজন কর্মচারী কাজ করেন। অবরোধের কারণে তাঁরা কার্যত কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। রেস্তোরাঁর জন্য আগে থেকে কেনা খাদ্যসামগ্রীও পড়ে থেকে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ীরা জানান, পর্যটক না থাকলেও রিসোর্ট-কটেজে অনেক কর্মচারী অবস্থান করছেন। কিন্তু যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় তাঁদের প্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছানো যাচ্ছে না। এতে কর্মচারীদের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দারাও ভোগান্তিতে পড়ছেন।
সাজেক রিসোর্ট-কটেজ মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, পর্যটক না থাকায় প্রতিদিন আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন ব্যবসায়ীরা। পর্যটনকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ায় স্থানীয় কর্মসংস্থানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
পর্যটন মৌসুমে সাজেকের কর্মচাঞ্চল্য স্থানীয় মানুষের আয়ের অন্যতম উৎস হয়ে ওঠে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে আয় বন্ধ হলেও জীবনযাপনের খরচ কমেনি। ফলে ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি দিনমজুর, পরিবহনশ্রমিক, রেস্তোরাঁকর্মী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।
চার দাবিতে সমঝোতা, কাটেনি অচলাবস্থা
সাজেকের সংকট নিরসনে গত ২৬ অক্টোবর উজো বাজারে প্রশাসনের প্রতিনিধি ও অবরোধকারীদের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি আব্দুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া, রাঙামাটির সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ান, দুই জেলার জেলা প্রশাসক ও পুলিশ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে অবরোধকারীদের পাঁচ দফা দাবি নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে আব্দুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া জানান, পাঁচটি দাবির মধ্যে চারটি বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে। বাকি দাবিটি নিয়ে আরও আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
তবে মূল দাবি নিয়ে চূড়ান্ত সমঝোতা না হওয়ায় অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন অবরোধকারীরা। ফলে বৈঠকের পরও সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক করার বিষয়ে তাৎক্ষণিক সমাধান আসেনি। অবরোধের কারণে পর্যটন, পণ্য পরিবহন ও স্থানীয় জনজীবনে তৈরি হওয়া সংকটও অব্যাহত রয়েছে।
খাদ্য ও জরুরি চিকিৎসাসেবা নিয়ে উদ্বেগ
যোগাযোগব্যবস্থা দীর্ঘ সময় ব্যাহত থাকলে সাজেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে চাল, ডাল, তেলসহ প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য, জরুরি ও জীবনরক্ষাকারী ওষুধ এবং চিকিৎসাসামগ্রী পৌঁছানো নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, মানবিক বিবেচনায় এসব পণ্য সরবরাহে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে গুরুতর অসুস্থ রোগী ও দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার জন্য যোগাযোগ ও পরিবহনের বিকল্প ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সাজেকের ব্যবসায়ীরা দ্রুত পর্যটন ও পরিবহনব্যবস্থা স্বাভাবিক করার প্রত্যাশা করছেন। অন্যদিকে স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও জরুরি চিকিৎসাসেবা পেতে তাঁদের আরও সমস্যায় পড়তে হবে।
সাজেকের বর্তমান সংকট তাই শুধু পর্যটন ব্যবসার ক্ষতির হিসাব নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের প্রতিদিনের খাবার, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান ও স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার প্রশ্ন। অবরোধের সমাধান যত বিলম্বিত হবে, অর্থনৈতিক ক্ষতি ও জনদুর্ভোগ তত বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত অচলাবস্থা নিরসনের পাশাপাশি দুর্গম পাহাড়ি জনপদে জরুরি খাদ্য ও চিকিৎসাসামগ্রীর সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন অত্যন্ত জরুরি।
ভোরের আকাশ/সু.পা