ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সংঘবদ্ধ চক্রের হাতে সিএনজিতেই খুন

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরের কুমারশীল মোড় থেকে আশুগঞ্জ নিজ বাড়িতে যাওয়ার সময় গত ১৪ মে দুপুর বিকাল ৩টায় সিএনজিতে সংঘবদ্ধ চক্রের হাতে খুন হন জাহানারা বেগম।
অজ্ঞাতনামা আসামিরা সিএনজির ভিতরেই জাহানারাকে ছুরিকাঘাতে খুন করার পর সদর থানাধীন অষ্টগ্রাম এলাকায় রাস্তার পাশে একই তারিখ বিকাল ৫.২০ মিনিটের দিকে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। স্থানীয় এলাকাবাসী জাহানারাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে জাহানারা বেগমের ছেলে জুবায়েদুর রহমান খান ইমন বাদী হয়ে ১৮ মে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
মামলাটি রুজুর পর হতে সদর মডেল থানা পুলিশ ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন ও ঘটনার সাথে জড়িত আসামিদের গ্রেফতার এবং হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত আলামত উদ্ধারের জন্য অভিযান শুরু করেন।
থানা পুলিশ ঘটনাস্থলের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যালোচনা করে ঘটনায় ব্যবহৃত সিএনজির পিছনে "মা বাবার দোয়া- আয়াত পরিবহন" লেখা তথ্য সংগ্রহ করে; উক্ত তথ্যের সূত্র ধরেই ১৮ মে দুপুর দেড়টায় থানা পুলিশ সদর থানাধীন ফুলবাড়িয়া বাসস্ট্যান্ড এলাকার সিএনজি গ্যারেজ থেকে সিএনজির পিছনে একই "মা বাবার দোয়া- আয়াত পরিবহন" লেখাসহ সিএনজিটি শনাক্ত এবং উক্ত সিএনজি চালক মো. বাদশাকে গ্রেফতার করে।
একই দিনে থানা পুলিশ গ্রেফতারকৃত সিএনজি চালক বাদশার স্বীকারোক্তি মোতাবেক সদর থানাধীন উত্তর পৈরতলা এলাকার ভাড়া বাসা থেকে খুনের ঘটনার অপর সহযোগী আসামি মো. শরীফ উদ্দিনকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে গ্রেফতার এবং তার নিকট লুকায়িত খুনের ঘটনায় ব্যবহৃত ২টি ছুরি উদ্ধার করেন।
পরবর্তীতে আসামি শরীফ উদ্দিনের স্বীকারোক্তি মোতাবেক খুনের ঘটনায় জড়িত রিমা আক্তারকে পুলিশ সুলতানপুর এলাকার ভাড়া বাসা হতে রাত ৮টার দিকে গ্রেফতার করে এবং তার পড়নে থাকা বাদীর শনাক্ত মতে জাহানারা বেগমের ১টি সেলোয়ার, ১টি উড়না এবং ১জোড়া জুতা উদ্ধার করা হয়।
অতঃপর আসামি রিমা আক্তার এর স্বীকারোক্তি অনুযায়ী তার বান্ধবীর বাসা থেকে রাত সাড়ে ৯টার দিকে জাহানারা বেগমের ব্যবহৃত আরো ২টি উড়না, ১টি কামিজ ও ১টি সেলোয়ার উদ্ধার করা হয়।
গ্রেফতারকৃত শরীফ উদ্দিনের স্বীকারোক্তি মোতাবেক তার বাসা হতে ঘটনায় জড়িত অপর আসামি জোবায়ের হোসেন প্রকাশ হৃদয় এর একটি রক্তমাখা জিন্স প্যান্ট রাত সাড়ে১১টায় উদ্ধার করা হয়; যেটি খুনের সময় জোবায়ের পরিধান করেছিলেন।
হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত সকল আলামত পুলিশ উদ্ধারপূর্বক জব্দ তালিকা মূলে জব্দ করেন।
গ্রেফতারকৃতদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, ঘটনার দিন জাহানারা বেগমকে ছিনতাই এর উদ্দেশ্যে সংঘবদ্ধ চক্রটি তাকে সিএনজিতে তোলে। সিএনজিতে সংঘবদ্ধ চক্রটি ছিনতাই করার চেষ্টা করলে জাহানারা বেগম বাধা প্রদান ও চিৎকার করে। এক পর্যায়ে ছিনতাইকারীরা তাকে ছুরিকাঘাত করে রাস্তার পাশে ফেলে যায়।
জিজ্ঞাসাবাদে আরো জানা যায় যে, গ্রেফতারকৃত রিমা আক্তারের বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে ১টি নারী শিশু নির্যাতন মামলা, মো. বাদশাহ এর বিরুদ্ধে ২টি মাদক মামলা, মো. শরীফ উদ্দিনের বিরুদ্ধে নারী শিশু নির্যাতন আইন ও মাদকসহ ৭টি মামলা, জোবায়ের হোসেন প্রকাশ হৃদয়ের বিরুদ্ধে হত্যা, ডাকাতি, ধর্ষণ ও মানবপাচার আইনের ৭টি মামলা রয়েছে।
গ্রেফতারকৃত আসামি শাহজাহান মিয়ার মেয়ে রিমা আক্তারের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুলতানপুর গ্রামে, হিলু মিয়ার ছেলে বাদশাহ মিয়ার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার বিরাসার গ্রামে, শফিকুর রহমানের ছেলে মোঃ শরীফ উদ্দিনের বাড়ি আশুগঞ্জের ভবানীপুরে, মৃত তাজুল ইসলামের ছেলে জোবায়ের হোসেন প্রকাশ হৃদয়ের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার নরসিংসার গ্রামে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পুলিশের মিডিয়া উইং জানায়, গ্রেফতারকৃত আসামিদেরকে মঙ্গলবার (১৯ মে) বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে শরীফ উদ্দিন খুনের ঘটনার সাথে জড়িত থাকার বিষয়ে বিজ্ঞ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পুলিশ সুপার শাহ্ মোঃ আব্দুর রউফ জানান, 'এ ধরনের সংঘবদ্ধ অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে সিএনজি, অটোরিক্সা ও চালকদের তথ্য পুলিশের কাছে থাকা প্রয়োজন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে চালিত সিএনজি, অটোরিক্সা ও চালকদের তথ্য সম্বলিত একটি ডাটাবেজ তৈরির পরিকল্পনা জেলা পুলিশের রয়েছে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন।'