সিলেটে ডাম্পিং ইয়ার্ডে পড়ে আছে হাজারো জব্দ যানবাহন

সিলেট নগরী ও মেট্রোপলিটন এলাকার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে ট্রাফিক পুলিশ। এসব অভিযানে অটোরিকশা, সিএনজি, মোটরসাইকেল, ব্যাটারিচালিত টমটম, রিকশাসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহন আটক করা হচ্ছে। তবে কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও অনেক যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া কিংবা রেকার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা।
তাদের অভিযোগ, ট্রাফিক পুলিশের দেওয়া মাসিক টোকেনের আওতায় চলাচল করা যানবাহনগুলো নগরীর বিভিন্ন সড়কে অবাধে চলাচল করছে। এ কারণে ট্রাফিক পুলিশের মামলা ও রেকার কার্যক্রম নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের মধ্যে। সাধারণ মানুষও হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত ট্রাফিক পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বললে তারা বিষয়টি পুলিশ কমিশনারের নির্দেশনা অনুযায়ী করা হচ্ছে বলে জানান। তবে এই নির্দেশনার দোহাই দিয়ে ট্রাফিক পুলিশের ‘রেকার বাণিজ্য’ বেড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
অন্যদিকে, খোলা আকাশের নিচে পড়ে আছে হাজার হাজার জব্দ যানবাহন। কোনোটি ঝোপঝাড়ের মধ্যে পড়ে আছে, কোনোটি পানিতে ডুবে যাচ্ছে, আবার কোনো যানবাহনের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশও নেই। এমন চিত্র সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) ট্রাফিক বিভাগের দক্ষিণ সুরমার আলমপুরস্থ ডাম্পিং ইয়ার্ডের।
শুধু ডাম্পিং ইয়ার্ড নয়, বিভিন্ন থানার ভেতরে জব্দ করে রাখা যানবাহনের অবস্থাও নাজুক। কোনো গাড়ির ব্যাটারি নেই, কোনোটির হেডলাইট খুলে নেওয়া হয়েছে। আবার কোনো যানবাহনের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশও খোয়া গেছে। দীর্ঘদিন খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকায় অনেক যানবাহন দেখতে অনেকটা কঙ্কালের মতো হয়ে গেছে।
পুলিশ বলছে, স্থায়ী ডাম্পিং ইয়ার্ড ও শেড না থাকা এবং মামলার তদন্ত ও নিলাম প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার কারণে জব্দ করা যানবাহন যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে না। স্থায়ী ডাম্পিং ইয়ার্ড নির্মাণ করা গেলে এ সমস্যার সমাধান হবে বলে মনে করছেন এসএমপি কমিশনার সারোয়ার মোর্শেদ শামীম।
এসএমপি সূত্র জানায়, ট্রাফিক পুলিশের অভিযানে জব্দ করা যানবাহন দক্ষিণ সুরমার আলমপুরস্থ ডাম্পিং ইয়ার্ডে রাখা হয়। অন্যদিকে, বিভিন্ন মামলার আলামত হিসেবে জব্দ করা যানবাহন সংশ্লিষ্ট থানার কম্পাউন্ডে রাখা হয়। দিনের পর দিন খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকায় এসব যানবাহন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি পুলিশ হেফাজতে থাকা অবস্থায় কিছু গাড়ি ও মোটরসাইকেলের মূল্যবান যন্ত্রাংশ চুরি হয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
সরেজমিনে আলমপুর ডাম্পিং ইয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, হাজার হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশা, টমটম, মোটরসাইকেল ও বিভিন্ন ধরনের যানবাহন খোলা আকাশের নিচে পড়ে আছে। পুরো ডাম্পিং ইয়ার্ডের বিভিন্ন স্থানে হাঁটুপানি জমে রয়েছে। অযত্ন-অবহেলায় পড়ে থাকা অনেক যানবাহন ঝোপঝাড়ের আড়ালে হারিয়ে যেতে বসেছে। কোনো কোনো যানবাহন ডাম্পিং ইয়ার্ডে জমে থাকা পানিতে ডুবে আছে। ব্যাটারিচালিত রিকশাগুলোর বেশিরভাগই ব্যাটারি ছাড়া পড়ে আছে। অন্য যানবাহনগুলোরও বিভিন্ন মূল্যবান যন্ত্রাংশ নেই।
ডাম্পিং ইয়ার্ডে অরক্ষিত অবস্থায় যানবাহন পড়ে থাকার বিষয়ে এসএমপির উপকমিশনার (ট্রাফিক) সুদীপ্ত রায় বলেন, ট্রাফিক পুলিশের হাতে আটক করা গাড়িগুলো ডাম্পিংয়ে নেওয়া হলেও মালিকরা হালনাগাদ কাগজপত্র নিয়ে এলে সেগুলো ছেড়ে দেওয়া হয়। এ কারণে ডাম্পিংয়ে অতিরিক্ত যানবাহন থাকার কথা নয়। তবে যেসব যানবাহনের কাগজপত্র নেই এবং ব্যাটারিচালিত অবৈধ রিকশা, সেগুলো দীর্ঘদিন ধরে পড়ে আছে। শেড না থাকায় বাধ্য হয়ে খোলা আকাশের নিচে রাখতে হচ্ছে। ফলে কিছু যানবাহন নষ্ট হচ্ছে।
এদিকে, থানার ভেতরে উন্মুক্ত অবস্থায় রাখা যানবাহনের অবস্থা ডাম্পিং ইয়ার্ডের চেয়েও নাজুক। চোরাইপণ্য বা মাদকসহ জব্দ করা কিংবা দুর্ঘটনার শিকার যানবাহন মামলার আলামত হিসেবে বছরের পর বছর থানার ভেতরে পড়ে থাকে। তদন্ত শেষে বা আদালতের নির্দেশে মালিকরা যানবাহন নিতে এলে অনেক ক্ষেত্রেই তারা সেটির গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ পান না বলে অভিযোগ রয়েছে।
আবার আদালতের নির্দেশে যেসব যানবাহন নিলামে তোলা হয়, সেগুলোর অনেকগুলোই স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রি হচ্ছে। চলতি মাসে কয়েকটি মোটরসাইকেলের নিলাম অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে একেকটি মোটরসাইকেলের দাম ওঠে ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত।
নিলামে অংশ নেওয়া সোহেল আহমদ বলেন, একটি মোটরসাইকেলের দাম চাওয়া হয়েছিল ২৫ হাজার টাকা। কিন্তু সেটির বেশিরভাগ যন্ত্রাংশই ছিল না। তাই তিনি ৩ হাজার টাকা দর হাঁকেন। তার মতে, মোটরসাইকেলটি ভাঙারি হিসেবে বিক্রি করা ছাড়া অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা সম্ভব হবে না।
জব্দ করা যানবাহন নষ্ট হওয়ার বিষয়ে এসএমপি কমিশনার সারোয়ার মোর্শেদ শামীম বলেন, বর্তমানে যে পরিমাণ যানবাহন জব্দ রয়েছে, সেগুলো রাখার মতো পর্যাপ্ত ডাম্পিং ইয়ার্ড এসএমপির নেই। সাময়িকভাবে দুটি স্থানে এসব যানবাহন রাখা হচ্ছে। স্থায়ী ডাম্পিং ইয়ার্ড নির্মাণ করা গেলে যানবাহনগুলো ভালোভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে স্থায়ী শেডও নির্মাণ করা যাবে। এ বিষয়ে সিটি করপোরেশনের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
খোলা আকাশের নিচে যানবাহন রাখলে কিছুটা নষ্ট হওয়া স্বাভাবিক উল্লেখ করে কমিশনার বলেন, অস্থায়ী ডাম্পিং ইয়ার্ডের চারপাশে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা গেলে নিরাপত্তা আরও জোরদার করা সম্ভব হতো। পুলিশ দায়িত্ব পালন করলেও কিছু যানবাহনের যন্ত্রাংশ খোয়া যাওয়ার বিষয়টি সত্য বলেও স্বীকার করেন তিনি।
ভোরের আকাশ/জেআ