হরমুজ-লোহিত সাগর এড়িয়ে আফ্রিকা ঘুরে চট্টগ্রামে ক্রুড অয়েল

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাবে হরমুজ প্রণালি ও আশপাশের নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একের পর এক হামলা ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌরুটে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। এমন পরিস্থিতিতে ঝুঁকিপূর্ণ পথ এড়িয়ে দীর্ঘ সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আসছে এক লাখ টনের বেশি অপরিশোধিত জ্বালানি তেল বা ক্রুড অয়েল।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) জন্য ১ লাখ ৪ হাজার ২৬ টন ক্রুড অয়েল নিয়ে ‘এমটি নিনেমিয়া’ আগামী শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর একই জাহাজের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রথম ক্রুড অয়েলের চালান এসেছিল। ওই চালান দেশে পৌঁছানোর পর সংকটের কারণে সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির একটি ইউনিট পুনরায় চালু করা সম্ভব হয়।
বিপিসির আমদানি করা ক্রুড অয়েল পরিবহনের দায়িত্বে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি)। দেশের জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবার প্রচলিত নৌপথের পরিবর্তে বিকল্প দীর্ঘ রুটে জাহাজটি পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সাধারণ সময়ে সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালি হয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছাতে প্রায় ৪ হাজার ২০০ নটিক্যাল মাইল পথ পাড়ি দিতে হয়। এতে সময় লাগে আনুমানিক ১৩ থেকে ১৫ দিন।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ওই রুট এড়িয়ে ‘এমটি নিনেমিয়া’কে সুয়েজ খাল, জিব্রাল্টার প্রণালি ও আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্তের কেপ অব গুড হোপ ঘুরিয়ে বাংলাদেশে পাঠানো হচ্ছে। এতে সমুদ্রযাত্রার দূরত্ব বেড়েছে প্রায় ৯ হাজার নটিক্যাল মাইল এবং পুরো যাত্রায় সময় লাগছে প্রায় ৫২ দিন।
দীর্ঘ এই বিকল্প রুটের কারণে জাহাজ পরিচালনার ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অতিরিক্ত সময় সমুদ্রে অবস্থানের ফলে লো-সালফার ফুয়েল, মেরিন গ্যাস অয়েল, জাহাজ ভাড়া ও সুয়েজ খাল ব্যবহারের ফিসহ বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, বাড়তি ব্যয়ের পরিমাণ কয়েক মিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। তবে এর একটি অংশ নির্ধারিত বা ফিক্সড খরচ হওয়ায় চূড়ান্ত আর্থিক হিসাব দুই পক্ষের আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।
বিএসসি, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসির সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মার্শাল আইল্যান্ডের পতাকাবাহী ‘এমটি নিনেমিয়া’র দৈর্ঘ্য ২৪৯ দশমিক ৯৫ মিটার এবং প্রস্থ ৪৪ দশমিক ৪ মিটার। জাহাজটির ড্রাফট ১৪ দশমিক ৬ মিটার। ২০২৪ সালে নির্মিত জাহাজটি ঘণ্টায় প্রায় ১১ নটিক্যাল মাইল গতিতে চট্টগ্রামের দিকে এগিয়ে আসছে।
গত ২৩ জুলাই সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে ক্রুড অয়েল বোঝাই করে যাত্রা শুরু করে ‘এমটি নিনেমিয়া’। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে জাহাজটি এখন বাংলাদেশের জলসীমার কাছাকাছি রয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছানোর পর ছোট আকারের ট্যাংকারের মাধ্যমে ক্রুড অয়েল খালাস বা লাইটারিংয়ের প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, দেশের জ্বালানি সরবরাহ যাতে কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়, সে বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ক্রুড অয়েলবাহী জাহাজের বার্থিং, লাইটারিং, চলাচল ও খালাস কার্যক্রমে বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় অগ্রাধিকার দিয়ে আসছে।
ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসির এক কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৪ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন ক্রুড অয়েল পরিশোধন করছে প্রতিষ্ঠানটি। পরিশোধিত জ্বালানির মধ্যে ডিজেলের উৎপাদন সবচেয়ে বেশি। পাশাপাশি এলপিজি, ফার্নেস অয়েল, কেরোসিন, এমএস ও অকটেনসহ বিভিন্ন পেট্রোলিয়াম পণ্যও উৎপাদিত হচ্ছে।
ইস্টার্ন রিফাইনারির সংরক্ষণাগারে সাধারণত প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার টন ক্রুড অয়েল মজুত রাখা যায়। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সংকটের সময় সেই মজুতের একটি অংশ ব্যবহার করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ক্রুড অয়েলের সরবরাহ সংকটে গত ১২ এপ্রিল রাতে ইস্টার্ন রিফাইনারির ক্রুড অয়েল ডিস্টিলেশন ইউনিট সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। পরে ‘এমটি নিনেমিয়া’র মাধ্যমে নতুন চালান দেশে পৌঁছানোর পর গত ৮ মে ইউনিটটি আবার উৎপাদনে ফেরে। এর আগে মে মাসে একই জাহাজের প্রথম চালান দেশে পৌঁছানো ও ইস্টার্ন রিফাইনারি পুনরায় চালুর তথ্য বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে।
তবে শুধু ক্রুড অয়েলের ওপর নির্ভর না করে সংকট মোকাবিলায় সরকার বিকল্প উৎস থেকেও বিপুল পরিমাণ পরিশোধিত ডিজেল আমদানি করেছে। এর মাধ্যমে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে দেশের জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ইস্টার্ন রিফাইনারি বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিশোধনের সক্ষমতা রাখে। বর্তমানে দেশের মোট জ্বালানি তেলের চাহিদার বড় অংশই আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। এর মধ্যে ডিজেলের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। এরপর রয়েছে ফার্নেস অয়েল, পেট্রল, অকটেন, কেরোসিন ও উড়োজাহাজে ব্যবহৃত জেট ফুয়েল।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত ও গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এ পরিস্থিতিতে মজুত বাড়ানো, বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরি ও দেশের নিজস্ব তেল পরিশোধন সক্ষমতা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি আমদানিতে বিকল্প নৌপথ ও সরবরাহ উৎসের গুরুত্ব আরও বাড়বে। ফলে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় পর্যাপ্ত মজুত ও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ভোরের আকাশ/জেআ