মাদকের ছোবলে বিপর্যস্ত গাইবান্ধা, উদ্বেগে অভিভাবক-সচেতন মহল

উত্তরের জেলা গাইবান্ধায় উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে মাদকের বিস্তার। শহর থেকে গ্রাম প্রায় সর্বত্রই ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিল ও হেরোইনসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্যের সহজলভ্যতা বাড়ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এর সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে তরুণ-যুবসমাজ ও শিক্ষার্থীদের ওপর।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর গাইবান্ধা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে জেলায় ৮০০টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এ সময় ১৫২টি মামলা দায়ের এবং ১৭৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
অন্যদিকে জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে জেলার সাতটি থানায় মাদক-সংক্রান্ত ২১০টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন ২৭৯ জন।
মাদকের কারণে অনেকেই পড়াশোনা থেকে ছিটকে যাচ্ছে, জড়িয়ে পড়ছে অপরাধে, ভাঙছে পরিবার এবং বাড়ছে সামাজিক অস্থিরতা। ফলে অভিভাবক ও সচেতন মহলে বাড়ছে উৎকণ্ঠা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, একসময় সীমিত পরিসরে থাকা মাদক ব্যবসা এখন জেলার সাতটি উপজেলাতেই বিস্তার লাভ করেছে।
গাইবান্ধা শহরের শিল্পকলা একাডেমি এলাকা, শান্দারপট্টি, নতুন ব্রিজ, স্টেডিয়াম, বাংলাবাজার, অফিসার্স কোয়ার্টার, গোরস্থান মোড়, কলেজ মোড়, কাঠপট্টি, বালাসিঘাট, কামারজানি ও বল্লমঝাড়সহ বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই মাদকের অবাধ কেনাবেচার অভিযোগ রয়েছে। একই চিত্র সদর, সুন্দরগঞ্জ, গোবিন্দগঞ্জ, সাদুল্লাপুর, পলাশবাড়ী, সাঘাটা ও ফুলছড়ি উপজেলাতেও।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মাদকের সহজলভ্যতায় অনেক শিক্ষার্থী লেখাপড়ায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। কর্মহীন যুবকদের একটি অংশ মাদকসেবন ও মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়ছে। এর প্রভাবে পারিবারিক কলহ, সামাজিক অবক্ষয়, মানসিক বিষণ্নতা এবং বিভিন্ন ধরনের অপরাধও বাড়ছে।
গাইবান্ধা সচেতন শিক্ষার্থী সমন্বয়ক পরিষদের আহ্বায়ক ময়নুল ইসলাম বলেন, আগে মাদক শহরে বেচাকেনা হতো, কিন্তু এখন গ্রামাঞ্চলেও মাদকের ছড়াছড়ি হয়ে গিয়েছে। মাদক শুধু একজন ব্যক্তিকে নয়, পুরো পরিবার ও সমাজকে ধ্বংস করে দেয়। তরুণদের রক্ষা করতে হলে প্রশাসনের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজকেও আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।
শিক্ষক শফিউল ইসলাম বলেন, বর্তমানে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাদকের প্রভাব উদ্বেগজনক। বিদ্যালয়, পরিবার ও সমাজ সব জায়গা থেকেই সচেতনতা বাড়াতে হবে। তাহলে অনেকটা কমে যেতে পারে মাদকের থাবা।
মাদকের বিস্তার ঠেকাতে বিভিন্ন সময়ে মানববন্ধন, প্রতিবাদ সমাবেশ ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন করেছে সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো। তবে তাদের অভিযোগ, ধারাবাহিক ও দৃশ্যমান অভিযান না থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণে আসছে না।
বল্লমঝাড় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জুলফিকার রহমান বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের পাশাপাশি জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় জনগণকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সামাজিক প্রতিরোধই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। আমাদের ইউনিয়নের বিভিন্ন পয়েন্টে ইতি মধ্যেই মানববন্ধন সভা মাইকিং করেছি। মানুষকে মাদকের বিষয়ে সচেতন করার চেষ্টা করছি ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে।
মাদকের অন্ধকার জগৎ থেকে ফিরে আসার গল্পও রয়েছে। একসময় মাদকসেবন ও মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে দাবি করা মিজানুর রহমান বলেন, তিনি প্রায় দুই বছর ধরে মাদক থেকে দূরে রয়েছেন। তিনি অন্যদেরও এই পথ থেকে ফিরে এসে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আহ্বান জানান।
এ বিষয়ে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. আসিফ উর রহমান বলেন, মাদকসেবন মানুষের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক জীবনে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। দীর্ঘদিন মাদক গ্রহণ করলে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয় এতে স্মৃতিশক্তি কমে যায়।
এছাড়া মাদক হৃদ্রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোক, লিভার ও কিডনির ক্ষতি, শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসের রোগসহ বিভিন্ন জটিল শারীরিক সমস্যার কারণ হতে পারে বলে জানান এই চিকিৎসক।
কথা হয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের গাইবান্ধা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক রফিকুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি জানান, 'চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে জেলায় ৮০০টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এ সময় ১৫২টি মামলা দায়ের এবং ১৭৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গাইবান্ধার সকল স্থরের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে মাদক নির্মুলে আমাদের কাজ করতে হবে।
এ বিষয়ে গাইবান্ধার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) শরীফ আল রাজীব বলেন, 'মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে এ সমস্যা নির্মূল করা সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি ও সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।'
গাইবান্ধা-২ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য মো. আব্দুল করিম বলেন, 'মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার বিকল্প নেই। তাই মাদকের বিষয়ে সকলকে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।'
সংশ্লিষ্টদের মতে, মাদকের বিস্তার এখন শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি একটি বড় সামাজিক সংকটে পরিণত হয়েছে। আজকের একজন মাদকাসক্ত তরুণ মানে আগামী দিনের একটি বিপর্যস্ত পরিবার এবং একটি হারিয়ে যাওয়া সম্ভাবনা। তাই মাদকমুক্ত গাইবান্ধা গড়তে প্রশাসনের কঠোর ও নিরপেক্ষ অভিযান, আইনের কার্যকর প্রয়োগ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সমাজের সব স্তরের মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।
ভোরের আকাশ/ইউএম