ভোলায় জমি দখলের অভিযোগ: হামলা, উচ্ছেদের চেষ্টা, উল্টো মামলায় আতঙ্কে পরিবার

ভোলার চরনোয়াবাদ এলাকায় জমি-সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে এক অসহায় পরিবারকে পৈতৃক ভিটা থেকে উচ্ছেদের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, প্রভাবশালী একটি চক্রের ধারাবাহিক হামলা, মারধর, বাড়িঘর ভাঙচুর, লুটপাট এবং পাল্টা মামলা দিয়ে তাদের হয়রানি করা হচ্ছে। এতে পরিবারটি চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছে।
ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভোলা পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর চরনোয়াবাদ এলাকার বাসিন্দা মো. লোকমান ও তার পরিবার পৈতৃক সূত্রে পাওয়া জমিতে বসবাস করছেন। অন্যদিকে দৌলতখান উপজেলা থেকে আসা মোসলেউদ্দিনের পরিবার লোকমানদের পূর্বপুরুষের কাছ থেকে জমি কিনে একই এলাকায় বসতি স্থাপন করে।
লোকমান পরিবারের অভিযোগ, মোসলেউদ্দিন পরিবার ক্রয়কৃত জমির চেয়ে অতিরিক্ত জমি দখল করে রেখেছে। এ নিয়ে সত্তরের দশকে দায়ের হওয়া একটি দেওয়ানি মামলা এখনও আদালতে বিচারাধীন। দীর্ঘদিন ধরে এ বিরোধকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলেও স্থানীয় সালিসে কোনো সমাধান হয়নি।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২৪ এপ্রিল দুপুরে লোকমান তার ভোগদখলীয় জমির পাড়ে পাইলিংয়ের কাজ করতে গেলে বিরোধের সূত্রপাত হয়। অভিযোগ, প্রতিপক্ষের মিরাজ গালিগালাজ শুরু করেন। পরে লোকমান বাড়ির উঠানে গেলে শরিফ, সাখাওয়াত, মিরাজ ও নাজমীনসহ কয়েকজন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালান।
তাদের দাবি, হামলায় লোকমানের একটি দাঁত ভেঙে যায়, দুটি দাঁত নড়ে যায় এবং পিঠে আঘাত পেয়ে তার মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে যায়। একপর্যায়ে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যারও চেষ্টা করা হয়।
লোকমানকে রক্ষা করতে গেলে তার স্ত্রী তাসনুর বেগমও মারধরের শিকার হন। পরে হামলাকারীরা ঘরে ঢুকে নগদ ২০ হাজার টাকা ও দুই ভরি ওজনের এক জোড়া স্বর্ণের বালা লুট করে নেয় এবং বাড়িতে আগুন দেওয়ার হুমকি দেয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
পরে স্থানীয়রা আহত লোকমানকে উদ্ধার করে প্রথমে ভোলা সদর হাসপাতালে এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠান।
ঘটনার পর তাসনুর বেগম বাদী হয়ে ভোলা আদালতে চারজনের বিরুদ্ধে সিআর মামলা (নং-৬৩২/২০২৬) দায়ের করেন। আসামিরা হলেন শরিফ ওরফে টিম্পা, সাখাওয়াত, রিয়াজ ওরফে মিরাজ এবং নাজমীন সুলতানা।
ভুক্তভোগীদের দাবি, আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করলেও পুলিশ এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করেনি। প্রধান আসামি শরিফ স্থানীয় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক।
লোকমান পরিবারের অভিযোগ, মূল ঘটনা আড়াল করতে এবং তাদের এলাকা ছাড়া করতে প্রতিপক্ষের মিরাজ হোসেন ভোলা থানায় পাল্টা মামলা করেন। ওই মামলায় পুলিশ ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের আটক করে। পরে অসুস্থতার কারণে লোকমানকে ছেড়ে দেওয়া হলেও অন্য এক আসামিকে কারাগারে পাঠানো হয়।
বর্তমানে লোকমান তিন মাস ধরে অসুস্থ অবস্থায় কর্মহীন রয়েছেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি অসুস্থ হয়ে পড়ায় সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বলে জানান স্বজনরা।
তাসনুর বেগম বলেন, "তারা ৬০ শতাংশ জমি কিনে জোরপূর্বক ৯০ শতাংশ দখল করে রেখেছে। এখন আমাদের শেষ সম্বলটুকুও দখল করতে চায়। প্রভাবশালী হওয়ায় প্রশাসনের ওপরও প্রভাব খাটানো হচ্ছে। আমরা ঘর থেকে বের হতেও ভয় পাচ্ছি।"
তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মোসলেউদ্দিন ও তার ছেলে মিরাজ হোসেন।
তাদের দাবি, তারা পৈতৃক সূত্রে ৯০ শতাংশ জমির বৈধ মালিক এবং এ বিষয়ে আগের দুটি দেওয়ানি মামলায় তাদের পক্ষে রায় হয়েছে। বর্তমানে মামলাটি আপিল পর্যায়ে রয়েছে।
তাদের ভাষ্য, ২৪ এপ্রিল লোকমানরা পুকুরে পাইলিং করতে গেলে শরিফ বাধা দেন। এরপর লোকমান ও তার লোকজন শরিফের ওপর হামলা চালান। শরিফকে বাঁচাতে গেলে তার মা লুৎফুর নাহারও মারধরের শিকার হন। এ সময় তার স্বর্ণালংকার ও অর্থ ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এ ঘটনায় তারাও থানায় মামলা করেছেন।
তাদের দাবি, উচ্ছেদ, হামলা ও লুটপাটের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।
দীর্ঘদিনের জমি বিরোধ, হামলা এবং পাল্টাপাল্টি মামলার জেরে চরনোয়াবাদের লোকমান পরিবার এখন উচ্ছেদের আশঙ্কা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। ভুক্তভোগীরা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
ভোরের আকাশ/এনএ