হাম প্রতিরোধে ভেন্টিলেটর নয়, টিকাদানই একমাত্র সমাধান: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী

আইসিইউ বা ভেন্টিলেটর বাড়িয়ে নয়, সময়মতো কার্যকর টিকাদানের মাধ্যমেই হামের মতো মারাত্মক সংক্রামক রোগের বিস্তার ও মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত। তিনি বলেছেন, হাম প্রতিরোধে টিকাদানের বিকল্প নেই।
বুধবার (১৯ আগস্ট) সকালে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ‘হামের বিস্তার ও জিনগত নজরদারি’ শীর্ষক কর্মশালা ও গবেষণা অনুদান প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগ এবং আইসিডিডিআর,বির যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে হামের বিস্তার ও জিনগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে পরিচালিত গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালের টিকাদান ক্যাম্পেইনে সময়মতো উদ্যোগ না নেওয়া এবং নীতিগত গাফিলতির কারণে যে অনাক্রম্যতার ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, তারই প্রভাব বর্তমানে দেখা যাচ্ছে। শুধু ভেন্টিলেটর বা আইসিইউ শয্যা বাড়িয়ে হামে মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব নয়। রোগ প্রতিরোধ ও সময়মতো টিকাদানই এর কার্যকর সমাধান।
তিনি বলেন, টিকাদানের কার্যক্রম শতভাগ বাড়ানো হলেও বর্তমান প্রাদুর্ভাব পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে আরও দুই থেকে তিন মাস সময় লাগতে পারে। তবে এর মধ্যেই সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবা ও মাঠপর্যায়ে নজরদারি জোরদার করে শিশুমৃত্যু কমানোর চেষ্টা চলছে।
শিশু স্বাস্থ্যসেবা বিকেন্দ্রীকরণের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে ড. এম এ মুহিত বলেন, আগামী অক্টোবরের মধ্যেই দেশের পাঁচটি বিভাগীয় ও জেলা শহরে নবনির্মিত পাঁচটি পূর্ণাঙ্গ শিশু হাসপাতাল আনুষ্ঠানিকভাবে চিকিৎসাসেবা শুরু করবে।
তিনি আরও বলেন, তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করতে দেশের ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে ১৫০ শয্যায় উন্নীত করার কাজ চলছে। উপজেলা পর্যায়ে শিশু স্বাস্থ্য, মেডিসিন, সার্জারি ও গাইনি—এই চারটি বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
স্বাস্থ্য খাতে জনবল সংকট মোকাবিলায় বড় পরিসরে নিয়োগের পরিকল্পনার কথাও জানান স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে দ্রুত এক লাখ নতুন স্বাস্থ্য মাঠকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে। পাশাপাশি সংকট মোকাবিলায় শিগগিরই পাঁচ হাজার নতুন চিকিৎসক এবং পর্যায়ক্রমে প্রয়োজন অনুযায়ী নার্স ও মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।
স্বাস্থ্য খাতের জনবল কাঠামোকে ভারসাম্যপূর্ণ করতে চিকিৎসক, নার্স ও মেডিকেল টেকনোলজিস্টের অনুপাত আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল, বারডেম ও হলি ফ্যামিলির মতো স্বায়ত্তশাসিত কিন্তু সরকার-সমর্থিত ব্যবস্থাপনা মডেল স্বাস্থ্য খাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। ঢাকার বাইরে বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা সীমিত থাকায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের রোগীদের রাজধানীমুখী হতে হচ্ছে, যা জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার একটি কাঠামোগত দুর্বলতা।
এ কারণে ঢাকার বিভিন্ন ইনস্টিটিউটের মতো মানসম্মত বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি বিভাগীয় শহরে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. মো. নুরুল ইসলাম এবং আইইডিসিআরের পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকি। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এ কে এম আজিজুল হক।
গবেষণার মূল ফলাফল ও তথ্য-উপাত্ত যৌথভাবে উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম এবং আইসিডিডিআর,বির ভাইরোলজি বিভাগের প্রধান বিজ্ঞানী ড. মুস্তাফিজুর রহমান।
গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৬ সালে ছড়িয়ে পড়া হামের পেছনে ভাইরাসের নতুন কোনো ধরন দায়ী নয়। বরং বিশ্বজুড়ে প্রচলিত অত্যন্ত সংক্রামক ‘B3’ ধরনই এর জন্য দায়ী। এর সঙ্গে টিকাদান ও মাতৃদুগ্ধ থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডির ঘাটতিও সংক্রমণ ও মৃত্যুঝুঁকি বাড়িয়েছে।
গবেষণা অনুযায়ী, বিশেষ করে নয় মাস বয়সের আগেই মায়ের কাছ থেকে পাওয়া রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দ্রুত কমে যাওয়ায় এবং নিয়মিত টিকাদানে ঘাটতির কারণে ছয় থেকে নয় মাস বয়সী অপুষ্ট শিশুরা হামে আক্রান্ত ও মৃত্যুর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
ভোরের আকাশ/সু.পা