বিভিন্ন প্রকার ডালের পুষ্টিগুণ

পুষ্টিবিদ লিনা আক্তার
ডাল হলো এক প্রকার শিম জাতীয় ফসল।শিম জাতীয় উদ্ভিদের যে সব ভোজ্য শুকনো বীজ আমরা খাই, সেগুলোকে ডাল বলা হয়। মসুর ডাল, ছোলা, শিম এবং মটর ডাল সবই ডাল জাতীয় শস্য। সস্তা, টেকসই এবং অত্যন্ত বহুমুখী হওয়ার পাশাপাশি, ডাল জাতীয় শস্য বিভিন্ন পুষ্টিগুণও প্রদান করে।
ছোলা : ছোলা, যা গারবানজো বিন নামেও পরিচিত, প্রোটিন এবং খাদ্য আঁশ সমৃদ্ধ। এটি পটাশিয়াম, ভিটামিন সি এবং ফোলেটের একটি ভালো উৎস এবং কোলেস্টেরলমুক্ত। ছোলায় উপস্থিত আয়রন, ক্যালসিয়াম এবং জিঙ্কের মতো খনিজ উপাদান সুস্থ হাড় ও দাঁত বজায় রাখতে সাহায্য করে। এর উচ্চ আঁশের পরিমাণের কারণে এটি কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধ করতে এবং একটি সুস্থ পরিপাকতন্ত্র বজায় রাখতে সাহায্য করে। আপনি সালাদ বা এমনকি তরকারিতেও ছোলা যোগ করতে পারেন।
কিডনি বিনস বা রাজমা
আঁশ-সমৃদ্ধ জটিল শর্করা এবং কম গ্লাইসেমিক ইনডেক্স থাকায় রাজমা শক্তির একটি স্থিতিশীল উৎস। সালাদে (রান্না করা রাজমার সাথে কালো ও সাদা শিম মিশিয়ে একটি রঙিন থ্রি-বিন সালাদ তৈরি করা যায়) এবং মিনেস্ট্রোন স্যুপে এটি খেতে দারুণ লাগে। এছাড়াও রান্না করা রাজমার সাথে রসুন, জিরা এবং লঙ্কা মিশিয়ে একটি সুস্বাদু ক্রুডিটে ডিপ বা স্যান্ডউইচ স্প্রেড তৈরি করা যায়।
কালো মটরশুঁটি
এক পরিবেশন কালো শিমে প্রায় ১৫ গ্রাম ফাইবার এবং ১৫ গ্রাম প্রোটিন থাকে, যা একটি বেশ চমৎকার সংমিশ্রণ। এই শিমে আরও রয়েছে আয়রন, ফসফরাস, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, কপার এবং জিঙ্ক। প্রাকৃতিকভাবেই এতে সোডিয়ামের পরিমাণ কম এবং পটাশিয়াম থাকায় এটি রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে বলে জানা গেছে। এর ফাইবার কোলেস্টেরল কমাতে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাস করতে সহায়তা করে। মেক্সিকান খাবারে কালো শিমের স্বাদ চমৎকার। এটি স্যুপে (পেঁয়াজ, টমেটো এবং আপনার পছন্দের মশলার সাথে রান্না করা কালো শিম ব্লেন্ড করে), স্টার ফ্রাই এবং সালাদেও যোগ করা যেতে পারে।
লাল, হলুদ এবং বাদামী মসুর ডাল
রান্না করা প্রতি পরিবেশনে প্রায় ৯ গ্রাম প্রোটিন এবং ৮ গ্রাম ফাইবার থাকায় মসুর ডালে প্রোটিন ও ফাইবারের পরিমাণ কালো মটর এবং ছোলা থেকে সামান্য বেশি। বিশেষ করে অঙ্কুরিত মসুর ডালে আমাদের শরীরের পেশি গঠন, পুনরুজ্জীবন এবং শক্তির জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত অপরিহার্য অ্যামিনো অ্যাসিড রয়েছে। মসুর ডালে উপস্থিত ফোলেট নারীদের নিউরাল টিউব ত্রুটি প্রতিরোধ করতে, লোহিত রক্তকণিকা গঠনে সহায়তা করতে এবং হোমোসিস্টিনের মাত্রা বজায় রাখতে সাহায্য করে, যা উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে। এটি কারি, সালাদ, ডাল, পিটা রুটির পুর এবং পিউরিতে যোগ করুন। আপনি রান্না করা মসুর ডাল চটকে তাতে কাটা রসুন, পেঁয়াজ, টমেটো এবং এক চিমটি লবণ ও লঙ্কা গুঁড়ো মিশিয়ে একটি ডিপ তৈরি করতে পারেন। চং স্যুপ, ক্যাসেরোল এবং মাংসের সসে অতিরিক্ত টেক্সচার ও স্বাদ যোগ করার পাশাপাশি চর্বির পরিমাণ কমানোর জন্য মসুর ডাল যোগ করার পরামর্শ দেন।
মুগ ডাল
চীনা রান্নায় প্রায়শই ব্যবহৃত হয় মুগ ডাল। এটি প্রোটিন, ফাইবার, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং ফাইটোনিউট্রিয়েন্টের একটি চমৎকার উৎস। অন্যান্য কিছু ডালের মতো নয়, এতে অলিগোস্যাকারাইড (এক ধরনের কার্বোহাইড্রেট) থাকে যা গ্যাস ও পেট ফাঁপা প্রতিরোধ করে এবং কিছু ক্ষেত্রে শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ দূর করতেও সাহায্য করতে পারে। এক পরিবেশনে ফোলেটের দৈনিক প্রস্তাবিত চাহিদার প্রায় ১০০ শতাংশ পাওয়া যায়, যা ডিএনএ সংশ্লেষণ, কোষ ও টিস্যুর বৃদ্ধি, হরমোনের ভারসাম্য, জ্ঞানীয় কার্যকারিতা এবং প্রজননের জন্য একটি অপরিহার্য ভিটামিন। টমেটো এবং শসার সাথে মেশানো অঙ্কুরিত মুগ ডাল একটি স্বাস্থ্যকর নাস্তা হতে পারে। এটি দিয়ে প্যাটি তৈরি করা যায়, স্যুপে যোগ করা যায়, ডাল হিসেবে ব্যবহার করা যায় অথবা ডাম্পলিং-এর পুর হিসেবেও ব্যবহার করা যায়।
ব্রড বিনস
ফাভা বা বেল বিনস নামেও পরিচিত ব্রড বিনস হলো ডায়েটারি ফাইবারের (প্রতি ১০০ গ্রামে ৬৬ শতাংশ) একটি সমৃদ্ধ উৎস, যা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে এবং কোলনে কোলেস্টেরল-সংযোজী পিত্ত অ্যাসিডের পুনঃশোষণ কমিয়ে কোলেস্টেরলের মাত্রা হ্রাস করে। এক পরিবেশন ব্রড বিনসে ৩ মিলিগ্রাম আয়রন থাকে, যা পুরুষদের জন্য প্রস্তাবিত দৈনিক গ্রহণের ৩২ শতাংশ এবং মহিলাদের জন্য ১৪ শতাংশ। এগুলো ব্রাউন রাইসের সাথে বা রিসোটোতে মিশিয়ে খাওয়া যায়।
কালো মটরশুঁটি
এগুলিতে প্রোটিন ও ফাইবার বেশি পরিমাণে থাকে এবং অন্যান্য সাধারণ শিম ও ডালের তুলনায় এগুলির গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কম, তাই এগুলি ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য উপকারী। এগুলির ভিটামিন এ এবং ভিটামিন সি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট আমাদের শরীরকে ফ্রি র্যাডিকেলের কারণে সৃষ্ট ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে এবং সম্ভবত ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়। এগুলি সালাদে মেশানো, স্টু ও স্যুপে যোগ করা, কারি ও স্টার-ফ্রাই তৈরি করা এবং ভর্তা করে প্যাটিসের সাথে মেশানো যেতে পারে।
রান্নার পদ্ধতির ওপর পুষ্টিমান
ডাল নির্দিষ্ট উপায়ে প্রস্তুত ও পরিবেশন করলে সবচেয়ে বেশি উপকার পাওয়া যায়। কিন্তু ভুল সংমিশ্রণে ডাল খেলে স্বাস্থ্য সমস্যা হতে পারে। কারণ ডালে রয়েছে লুকানো অ্যান্টি-নিউট্রিয়েন্ট যা সঠিকভাবে রান্না না করলে হজমে সমস্যা তৈরি করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে—
১। কাঁচা বা অর্ধসেদ্ধ ডালে লেকটিন, স্যাপোনিন এবং ট্যানিনের মতো পুষ্টিবিরোধী উপাদান থাকে যা পুষ্টি শোষণে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এই পুষ্টিবিরোধী উপাদান দূর করতে এবং হজমশক্তি উন্নত করতে ভালোভাবে ভিজিয়ে রাখুন, অঙ্কুরিত করুন এবং ভালোভাবে রান্না করুন।
২। ডালজাতীয় শস্যে প্রচুর আয়রন থাকলেও এটি ভালোভাবে শোষিত হয় না। কারণ এটি নন-হিম আয়রন। এজন্য ডালজাতীয় শস্য খাওয়ার সময় ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার যোগ করতে হবে।
৩। ডাল প্রোটিনের ভালো উৎস হলেও এটি সম্পূর্ণ প্রোটিনের উৎস নয়। এতে কিছু অ্যামিনো অ্যাসিডের ঘাটতি থাকে। তাই দুই বা ততোধিক ডাল একসাথে মিশিয়ে খাবেন অথবা অন্য কোনো প্রোটিন জাতীয় খাবার যোগ করে খাবেন। যেমন ভাত-ডাল সংমিশ্রণে খেতে পারেন। কারণ ভাতে লাইসিনের পরিমাণ কম কিন্তু মেথিওনিনের পরিমাণ বেশি, আবার ডালে লাইসিন বেশি কিন্তু মেথিওনিন কম। দুটো একত্রে খেলে অ্যামিনো অ্যাসিডের ঘাটতি পূরণ হবে। এছাড়া ব্রাউন ব্রেডে পিনাট বাটার যোগ করে খেতে পারেন।
৪। ডালে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার রয়েছে। তাই অতিরিক্ত গ্রহণ করলে প্রচুর পরিমাণে তরল পান করতে হবে, না হলে হজমজনিত সমস্যা হতে পারে।
৫। ডালে প্রোটিনের পাশাপাশি ক্যালরিও বেশি পাওয়া যায়। তাই সঠিক পরিমাণে শস্যের সাথে ডাল মিশিয়ে এবং অন্যান্য উদ্ভিদভিত্তিক প্রোটিনযুক্ত খাবার অন্তর্ভুক্ত করলে পুষ্টির গুণগত মান উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে।
লেখক : পুষ্টিবিদ, রাইয়ান হেলথ কেয়ার হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, দিনাজপুর



