হামের টিকাদান কর্মসূচির দুই মাস পরও কমছে না সংক্রমণ

ছবি: সংগৃহীত
দেশব্যাপী হামের টিকাদান কর্মসূচি শুরুর দুই মাস পার হলেও সংক্রমণ কমার স্পষ্ট কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। গত ৫ এপ্রিল ১৮ জেলার ৩০টি উপজেলায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে হামের টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়। পরে ২০ এপ্রিল সারাদেশে এই কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হয়। তবে দুই মাস অতিবাহিত হওয়ার পরও প্রতিদিনই হাজারের বেশি মানুষ হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত হচ্ছেন বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য থেকে জানা গেছে।
যদিও স্বাস্থ্যমন্ত্রী একাধিকবার দাবি করেছেন, দেশে হামের সংক্রমণ কমেছে। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামে বিষয়ক দৈনিক বুলেটিনে ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। বুলেটিন অনুযায়ী, ৩ জুন হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ১ হাজার ২১০ জন। এর আগের দিন আক্রান্ত ছিলেন ১ হাজার ১৩৪ জন। ১ জুন আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ২৯২ জন। মে মাসের শেষ দিকেও প্রতিদিন আক্রান্তের সংখ্যা এক হাজারের বেশি ছিল। ৩১ মে আক্রান্ত হন ১ হাজার ৩২৪ জন, ৩০ মে ১ হাজার ৩৩ জন, ২৭ মে ১ হাজার ৫৬ জন, ২৬ মে ১ হাজার ৮৩ জন এবং ২৫ মে ১ হাজার ২২৭ জন।
ঈদের ছুটির সময় আক্রান্তের সংখ্যা কিছুটা কমলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ২৯ মে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৬৭৪ জন এবং ঈদের দিন ২৮ মে ছিল ৮২৬ জন।
কেন কমছে না সংক্রমণ?
হামের টিকাদান কর্মসূচি শুরুর দুই মাস পরও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে না আসার কারণ হিসেবে টিকার কাভারেজ কম হওয়ার বিষয়টিকে দায়ী করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, হামের টিকা কার্যকরভাবে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করতে হলে অন্তত ৯৫ শতাংশ কভারেজ নিশ্চিত করতে হয়। কিন্তু পর্যাপ্ত প্রচার-প্রচারণার অভাবে সেই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, “কর্মসূচি শুরুর সময়ই আমরা আশঙ্কা করেছিলাম যে পর্যাপ্ত জনসচেতনতা ছাড়া ৯৫ শতাংশ কভারেজ পাওয়া কঠিন হবে। হামের ক্ষেত্রে কভারেজ সামান্য কম হলেও সংক্রমণ চলতেই থাকে।” তার মতে, এবারের টিকাদান কর্মসূচিতে বয়সসীমায় পরিবর্তন আনা হয়েছিল। সাধারণত ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে হামের টিকা দেওয়া হলেও বিশেষ কর্মসূচির আওতায় ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের টিকা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে অনেক অভিভাবক যথেষ্ট তথ্য পাননি।
ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, “অনেক অভিভাবকের মধ্যে দ্বিধা ছিল—৬ মাস বয়সে টিকা দিলে কোনো সমস্যা হবে কি না, কিংবা বড় বয়সী শিশুদের আবার টিকা দেওয়া প্রয়োজন কি না। ব্যাপক প্রচারণা চালানো গেলে এ ধরনের বিভ্রান্তি দূর করা সম্ভব হতো।”
হাসপাতালে রোগীর চাপ
ডিএনসিসি হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ডা. আসিফ হায়দার জানান, ঈদের পর হাসপাতালে রোগী ভর্তির চাপ কিছুটা কমেছে। বর্তমানে প্রতিদিন ১০০ জনের কম রোগী ভর্তি হচ্ছে। তবে তিনি মনে করেন, ঈদের ছুটির কারণেও সাময়িকভাবে এই সংখ্যা কমে থাকতে পারে। তিনি বলেন, “গত ২৪ ঘণ্টায় আমাদের আইসিইউতে ৫৪ জন রোগী ছিল। এখনও দুটি আইসিইউ শয্যা খালি রয়েছে। পাশাপাশি শিশুদের জন্য পিআইসিইউতে পাঁচটি শয্যা চালু করা হয়েছে।”
মৃত্যু বাড়ছেই
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে হামের উপসর্গে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫১১ জনে। অন্যদিকে, পরীক্ষায় নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত ৯০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ফলে নিশ্চিত ও উপসর্গভিত্তিক মৃত্যু মিলিয়ে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬০১ জনে। একই সময়ে সারাদেশে নতুন করে ১ হাজার ৫২ জন হাম রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, যা সংক্রমণের পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে বলে ইঙ্গিত দেয়।
ভোরের আকাশ/সু.পা



