খেজুরের গুরুত্ব ও আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞানে এর মর্যাদা

ছবি: সংগৃহীত
খেজুর এখন সারা বিশ্বেই জনপ্রিয় একটি ফল। এর রয়েছে নানা জাত ও বৈচিত্র্য। প্রখ্যাত দার্শনিক প্লিনি দ্য এলডার খেজুরের প্রায় ৪৯টি জাতের কথা উল্লেখ করেছেন। পবিত্র কোরআন ও হাদিসেও খেজুরকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শুধু ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেই নয়, আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞানেও খাদ্যমানের বিচারে বিভিন্ন ফলের মধ্যে খেজুরের অবস্থান শীর্ষ পর্যায়ে।
ইসলামে খেজুরকে আল্লাহপ্রদত্ত বরকতময় ফল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শরীর ও আত্মার সুস্থতায় খেজুর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। রাসুলুল্লাহ (সা.) খেজুরবিহীন ঘরকে দরিদ্র ঘর হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কোরআনেও খেজুর বারবার এসেছে সৃষ্টিকর্তার অনুগ্রহ ও প্রাচুর্যের প্রতীক হিসেবে। বিশ্বাসীদের জন্য জান্নাতে খেজুর গাছ থাকার কথাও বলা হয়েছে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনের নানা স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে খেজুর।
হাদিসে বর্ণিত আছে, একবার একটি খেজুর গাছ রাসুল (সা.)-এর সামনে সম্মান জানিয়ে নত হয়েছিল। মদিনায় ইসলামের প্রথম মসজিদ নির্মাণেও ব্যবহৃত হয়েছিল খেজুরপাতা। মুয়াজ্জিন হজরত বেলাল (রা.) প্রায়ই খেজুর গাছে উঠে আজান দিতেন। মুসলিম শিল্প ও স্থাপত্যেও খেজুর গাছের প্রভাব লক্ষণীয়। মিনারের নকশাতেও খেজুর গাছের প্রভাব রয়েছে বলে মনে করা হয়। প্রচলিত একটি প্রবাদ হলো—‘খেজুর গাছের মতো হও, কেউ ঢিল ছুড়লে জবাবে একটি মিষ্টি খেজুর দাও।’
আরব সংস্কৃতির অন্যতম পরিচায়ক হিসেবেও খেজুর গাছ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। আরবরা যখন বাগদাদ থেকে স্পেনের আন্দালুসিয়ায় যায়, তখন খেজুরের বিস্তারও সেখানে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে ইতালি ও ইউরোপের অন্যান্য অনুকূল আবহাওয়ার অঞ্চলেও এর চাষ শুরু হয়। খেজুরকে ঘিরে বিভিন্ন অঞ্চলে উৎসবের আয়োজনও দেখা যায়। দক্ষিণ লিবিয়া ও উত্তর শাদের সীমান্তবর্তী টিবেস্টি অঞ্চলে খেজুরকেন্দ্রিক উৎসব বিশেষভাবে পরিচিত। সেখানে খেজুর চাষ স্থানীয় জীবনযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। উৎসবে খেজুর গাছকে ঘিরে নৃত্য ও খেজুরজাত পানীয় পরিবেশনের প্রচলন রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সামাজিক উৎসবেও খেজুরের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। বাহরাইনে বিয়ের অনুষ্ঠানে খেজুরের শাখা দিয়ে ফটক সাজানো হয়, যা আনন্দ ও আশীর্বাদের প্রতীক। ওমানে এখনো ছেলেসন্তান জন্মের পর একটি খেজুর গাছ রোপণের ঐতিহ্য প্রচলিত রয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে খেজুরচাষিদের মধ্যে প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয় এবং সেরা চাষিকে পুরস্কৃত করা হয়। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াতেও খেজুর উৎসব অনুষ্ঠিত হয়।
মানবসভ্যতায় খেজুর চাষের ইতিহাস হাজার বছরের পুরোনো। খেজুর গাছে নারী ও পুরুষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে এবং শুধু নারী গাছেই ফল ধরে। একটি পূর্ণবয়স্ক খেজুর গাছ থেকে বছরে প্রায় ১০ হাজার খেজুর পাওয়া যায়, যার ওজন ১০০ কেজিরও বেশি হতে পারে।
শুকনো কিংবা তাজা—উভয় অবস্থাতেই খেজুরে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিন, খনিজ উপাদান ও হজমে সহায়ক খাদ্যআঁশ। এছাড়া মানবদেহকে বিভিন্ন রোগ থেকে সুরক্ষা দিতে সহায়ক অ্যান্টিঅক্সিডেন্টেরও বড় উৎস খেজুর। প্রাকৃতিক চিনি বা ফ্রুকটোজসমৃদ্ধ হওয়ায় রমজানে ইফতারে খেজুর দ্রুত শক্তি জোগাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন স্বাদ, আকার ও রঙের খেজুর পাওয়া যায়। তবে জনপ্রিয়তার দিক থেকে পাঁচটি জাত বিশেষভাবে পরিচিত।
১. আজওয়া খেজুর : মুসলমানদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় খেজুরগুলোর একটি। সৌদি আরবের মদিনাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে এর চাষ হয়। কালচে-বাদামি রঙের এই খেজুর নরম, রসালো ও অত্যন্ত মিষ্টি।
২. মেডজুল খেজুর : আকারে বড়, সুগন্ধি ও বেশ মিষ্টি। বাজারে সাধারণত কিং মেডজুল ও ব্ল্যাক মেডজুল নামে দুটি ধরন পাওয়া যায়।
৩. মাবরুম খেজুর : লম্বাটে আকৃতির এই খেজুর লালচে-বাদামি রঙের হয়। আঁশসমৃদ্ধ এবং তুলনামূলক কম মিষ্টি।
৪. দেগলেত নূর খেজুর : মাঝারি আকারের বাদামি রঙের এই খেজুরের মিষ্টতা কিছুটা কম। কেক, রুটি ও মিষ্টান্ন তৈরিতে এটি বেশি ব্যবহৃত হয়।
৫. পিয়ারোম খেজুর : প্রায় কালো রঙের এ খেজুর তুলনামূলক শুকনো এবং স্বাদের জন্য বিখ্যাত।
বিশেষ খেজুরের মধ্যে ইরাকের ‘জাইদি’ উল্লেখযোগ্য। এটি বাগদাদের অন্যতম অর্থকরী ফসল। যেকোনো আবহাওয়ায় টিকে থাকতে সক্ষম হওয়ায় জাইদি বেশ জনপ্রিয়। উচ্চমাত্রার চিনির কারণে ইরাকের ঐতিহ্যবাহী পানীয় ‘আরক’ তৈরিতেও এটি ব্যবহৃত হয়।
মিসরের সবচেয়ে মূল্যবান খেজুর ‘হায়ানি’। হায়ান নামের একটি গ্রামের নাম অনুসারে এর নামকরণ করা হয়েছে। একসময় হজযাত্রীরা এ গ্রামে বিশ্রাম নিতেন। তিউনিসিয়ার ‘মানখির’ খেজুর লম্বাটে ও দেখতে নাকের মতো। এছাড়া আলজেরিয়ার ‘থুরি’ এবং দক্ষিণ ইরানের ‘মাজাফাতি’ খেজুরও বেশ পরিচিত।
বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর প্রায় ৯০ লাখ টন খেজুর উৎপাদিত হয়। উৎপাদনে শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে মিসর, সৌদি আরব, ইরান, আলজেরিয়া ও ইরাক। এর মধ্যে মিসর একাই বছরে প্রায় ১৭ লাখ টন খেজুর উৎপাদন করে, যা বিশ্ব উৎপাদনের প্রায় ১৮ শতাংশ। অর্থাৎ বিশ্বে উৎপাদিত প্রতি পাঁচটি খেজুরের একটি আসে মিসর থেকে। সৌদি আরব ও ইরান যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে পাকিস্তানও উল্লেখযোগ্য উৎপাদক দেশ।
খেজুর রপ্তানিতেও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এগিয়ে। সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম বড় খেজুর রপ্তানিকারক দেশ। ২০২১ সালে দেশটি প্রায় ৩২ কোটি ৯০ লাখ ডলারের খেজুর রপ্তানি করেছে। এর পর রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও তিউনিসিয়া। অন্যদিকে খেজুর রপ্তানিতে দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে ইসরায়েল।
খেজুর আমদানির ক্ষেত্রে ভারত বিশ্বের শীর্ষ দেশ। ২০২১ সালে দেশটি প্রায় ২৩ কোটি ৬০ লাখ ডলারের খেজুর আমদানি করে। এর পর রয়েছে মরক্কো ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। বাংলাদেশও খেজুর আমদানিতে এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে মূলত ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, আলজেরিয়া ও পাকিস্তান থেকে খেজুর আমদানি করা হয়।
বর্তমানে বিশ্বে খেজুর উৎপাদন, রপ্তানি ও আমদানির বাজারে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোর আধিপত্য সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশ এখনো এসব অঞ্চলের ওপর আমদানির জন্য অনেকাংশে নির্ভরশীল।
ভোরের আকাশ/সু.পা



