শৈশব কি স্ক্রিনে বন্দি হয়ে যাচ্ছে?
নীরবে বাড়ছে শিশুস্বাস্থ্যের সংকট—দায় কার, পরিবার না সমাজ?

সাইমা আক্তার সুইটি
একটা সময় ছিল, বিকেলের মাঠ মানেই ছিল শিশুদের দৌড়ঝাঁপ, হাসি আর প্রাণের উচ্ছ্বাস। আজ সেই মাঠ ফাঁকা—কারণ শিশুরা এখন ব্যস্ত মোবাইল স্ক্রিনে। খেলাধুলার জায়গা নিয়েছে ভার্চুয়াল গেম, আর বন্ধুত্বের জায়গা নিয়েছে একাকী স্ক্রলিং।
এই পরিবর্তন শুধু জীবনধারার নয়—এটি একটি গভীর স্বাস্থ্য সংকটের সূচনা।
প্রশ্নটা সহজ, কিন্তু অস্বস্তিকর— আমরা কি আমাদের শিশুদের শৈশব কেড়ে নিচ্ছি?
পুষ্টিহীনতার নতুন রূপ : Hidden Hunger
“খিদে নেই, তবুও শরীর ক্ষুধার্ত!”
লুকানো ক্ষুধা হলো এমন একটি অবস্থা, যখন শরীরে স্বাভাবিকভাবে কাজ করার জন্য পর্যাপ্ত শক্তি (ক্যালোরি) থাকলেও সুস্বাস্থ্য বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় আয়রন, জিঙ্ক, ভিটামিন বি১২ এবং ভিটামিন ডি-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ অণুপুষ্টির অভাব থাকে।
বর্তমান সময়ের শিশুদের অনেকেই নিয়মিত খাবার পাচ্ছে, কিন্তু সেই খাবারে সঠিক পুষ্টি নেই। ফাস্টফুড, অতিরিক্ত চিনি, প্রক্রিয়াজাত খাবার—এসব এখন দৈনন্দিন খাদ্যতালিকার অংশ হয়ে উঠেছে।
ফলে তৈরি হচ্ছে এক ভয়ংকর অবস্থা—
“হিডেন হাঙ্গার” বা অদৃশ্য অপুষ্টি।
শিশুর পেট ভরা, কিন্তু শরীর পুষ্টিহীন।
এতে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, মনোযোগে ঘাটতি দেখা দেয়, এমনকি স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত হয়।
খাদ্যাভ্যাস: শুধু খাওয়া নয়, একটি জীবনদর্শন
শিশুর সুস্থতা কোনো একদিনের ভালো খাবারে গড়ে ওঠে না—এটি তৈরি হয় প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাস থেকে। আমরা প্রায়ই সহজ পথ বেছে নিই—চটজলদি কিছু খাইয়ে দিই, বাচ্চা চুপ থাকলেই স্বস্তি পাই।
কিন্তু এই “সহজ” পথটাই ধীরে ধীরে কঠিন বাস্তবতা তৈরি করে।
একটি শিশুর খাবার হওয়া উচিত রঙিন, প্রাকৃতিক এবং জীবন্ত— যেখানে থাকবে তাজা ফল, সবজি, ডাল, মাছ, দুধের মতো সহজ খাবার। কারণ প্রকৃতির কাছাকাছি যত খাবার, ততই তা শরীরের জন্য উপকারী।
শিশুকে জোর করে খাওয়ানো নয়— বরং তাকে শেখাতে হবে খাবারকে ভালোবাসতে। খাবারের সঙ্গে যদি আনন্দ, গল্প, পরিবার—এই অনুভূতিগুলো জড়িত থাকে, তাহলে সেই অভ্যাস সারাজীবন থাকে।
মনে রাখতে হবে— আজ আমরা যা খেতে শেখাচ্ছি, কাল সেটাই তার জীবনের অভ্যাস হয়ে যাবে।
স্থির জীবনযাপন: নীরব ঝুঁকি
স্ক্রিন-নির্ভর জীবন শিশুদের শারীরিক কার্যক্রম প্রায় শূন্যে নামিয়ে এনেছে। ফলাফল—স্থূলতা, দুর্বল পেশী, কম সহনশীলতা। যে বয়সে দৌড়ানো, লাফানো আর খেলাধুলা করার কথা, সেই বয়সেই তারা বসে বসে ভবিষ্যতের রোগ তৈরি করছে।
মানসিক স্বাস্থ্যের অদৃশ্য সংকট
শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য এখন একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। একাকীত্ব, ভার্চুয়াল নির্ভরতা, পড়াশোনার চাপ—সব মিলিয়ে তারা ভেতরে ভেতরে চাপে ভুগছে। অনেক শিশু কথা বলতে চায়, কিন্তু শোনার মানুষ পায় না। তাদের নীরবতা আমাদের অজান্তেই বড় সমস্যার দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
দায় এড়ানোর সুযোগ নেই
আমরা প্রায়ই প্রযুক্তিকে দোষ দিই। কিন্তু বাস্তবতা হলো—প্রযুক্তি নয়, এর ব্যবহারই আসল বিষয়। একটি শিশুর হাতে মোবাইল কে তুলে দিচ্ছে? উত্তরটা আমাদের কাছেই।
সমাধান: ছোট পরিবর্তন, বড় প্রভাব
পরিবর্তন শুরু হতে পারে খুব সহজ কিছু অভ্যাস দিয়ে—
- প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় “স্ক্রিনমুক্ত সময়”
- নিয়মিত শারীরিক খেলাধুলা
- পরিবারে একসঙ্গে বসে খাওয়ার অভ্যাস
- শিশুর সঙ্গে খোলামেলা কথা বলা
আমরা যদি এখনই সচেতন না হই, তাহলে খুব শিগগিরই আমাদের সামনে দাঁড়াবে একটি দুর্বল, অসুস্থ এবং মানসিকভাবে ক্লান্ত প্রজন্ম। শিশুরা শুধু আমাদের ভবিষ্যৎ নয়—তারা আমাদের বর্তমানের দায়িত্ব। শৈশবকে স্ক্রিনের ভেতরে নয়, জীবনের ভেতরে ফিরিয়ে আনতে হবে। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, ভালোবাসা এবং সচেতন যত্নই গড়ে তুলবে একটি সুস্থ আগামী।
লেখক : পুষ্টিবিদ



