দেশে প্রথম ‘ইমোশনাল ডোনার’ কিডনি প্রতিস্থাপন বিএমইউতে

দেশে প্রথমবারের মতো ‘ইমোশনাল ডোনার’ বা আবেগগতভাবে সম্পৃক্ত স্বেচ্ছাদাতার মাধ্যমে সফলভাবে কিডনি প্রতিস্থাপন সম্পন্ন হয়েছে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ)। এর মধ্য দিয়ে দেশে কিডনি প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) সকালে বিএমইউতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান উপাচার্য। একই দিনে সফলভাবে কিডনি প্রতিস্থাপন করা রোগীকে ছাড়পত্র প্রদান উপলক্ষে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানে রোগী নিজের অনুভূতি প্রকাশ করলে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী বলেন, “বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ইমোশনাল ডোনারের মাধ্যমে কিডনি প্রতিস্থাপন সফলভাবে সম্পন্ন করেছে বিএমইউ। এর মাধ্যমে কিডনি প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।”
তিনি বলেন, নিকট আত্মীয়ের পাশাপাশি আইনগত প্রক্রিয়া ও নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে আবেগগতভাবে সম্পৃক্ত অন্য কোনো ব্যক্তিও স্বেচ্ছায় কিডনি দান করতে পারবেন।
তিনি জানান, ইমোশনাল ডোনার যাচাই-বাছাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সংস্থাগুলো কাজ করছে। সম্ভাব্য ডোনারের আইনগত বিষয়গুলো যাচাইয়ের পরই প্রতিস্থাপনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। পাশাপাশি হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ টিম ডোনারের মেডিকেল পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ বিভিন্ন বিষয় মূল্যায়ন করে। রোগীর সঙ্গে ডোনারের সম্পর্ক, দানের স্বেচ্ছাসম্মতি ও পুরো প্রক্রিয়াটি যথাযথ কি না, তাও যাচাই করা হয়।
অধ্যাপক সিদ্দিকী আরও বলেন, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতোমধ্যে লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট কার্যক্রমও চলমান রয়েছে। ধীরে ধীরে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে বিএমইউ আরও সক্ষমতা অর্জন করছে।
তবে কিডনি দানের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অর্থ লেনদেনের সুযোগ নেই বলে কঠোরভাবে উল্লেখ করেন উপাচার্য। তিনি বলেন, “অর্থের বিনিময়ে কিডনি দান বা গ্রহণের কোনো সুযোগ নেই। কিডনি দান হতে হবে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় এবং প্রচলিত আইন ও নির্ধারিত শর্ত মেনে।”
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রান্সপ্ল্যান্ট টিমের সদস্য ও ইউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. রফিকূল ইসলাম বলেন, “দেশের প্রথম ইমোশনাল ডোনার কিডনি প্রতিস্থাপন দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার জন্য একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।”
তিনি বলেন, এর মাধ্যমে কিডনি প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দেশেই এ ধরনের জটিল ও আধুনিক চিকিৎসা সম্ভব হওয়ায় ভবিষ্যতে রোগীদের চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা কমবে। এতে রোগীদের ভোগান্তির পাশাপাশি চিকিৎসার পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয়ের চাপও কমানো সম্ভব হবে।
অধ্যাপক রফিকূল ইসলাম বলেন, এই সফলতা শুধু একজন রোগীর চিকিৎসায় সাফল্য নয়; বরং বাংলাদেশের অঙ্গ প্রতিস্থাপন চিকিৎসার সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
বিএমইউ সূত্রে জানা যায়, বাগেরহাট থেকে আসা দীর্ঘমেয়াদি কিডনি জটিলতায় আক্রান্ত একজন রোগী গত ১০ আগস্ট ২০২৬ বিএমইউতে ভর্তি হন। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, যাচাই-বাছাই ও আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর ৩১ আগস্ট তার কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়। গাইবান্ধা থেকে আসা একজন আবেগগতভাবে সম্পৃক্ত স্বেচ্ছাদাতা ওই রোগীকে কিডনি দান করেন।
সফল অস্ত্রোপচার ও পরবর্তী চিকিৎসা শেষে শনিবার রোগীকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। ছাড়পত্র প্রদান অনুষ্ঠানে রোগী নিজের চিকিৎসা-অভিজ্ঞতা ও নতুন জীবন ফিরে পাওয়ার অনুভূতি ব্যক্ত করেন। এ সময় উপস্থিত চিকিৎসক, স্বজন ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। রোগী ও তার স্বজনরা সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া আদায় করেন এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বিএমইউর প্রো-ভিসি (শিক্ষা) অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম, প্রো-ভিসি (গবেষণা) অধ্যাপক ডা. মুজিবুর রহমান হাওলাদার, ইউরোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সাইফুল ইসলাম, নেফ্রোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. এ এইচ হামিদ আহমেদ, গ্রহীতা টিমের সার্জন অধ্যাপক ডা. এ কে এম খুরশিদুল আলম, ডোনার টিমের সার্জন অধ্যাপক ডা. শফিকুর রহমানসহ ট্রান্সপ্ল্যান্ট টিমের সদস্য, বিভিন্ন পর্যায়ের চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
বিএমইউর এই সফলতার মধ্য দিয়ে দেশে কিডনি প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে আইনসম্মত, নিরাপদ ও মানবিক কাঠামোর মধ্যে অঙ্গদানের সুযোগ সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ভোরের আকাশ/জেআ