ট্রাম্পের চাপ সত্ত্বেও ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধজাহাজ পাঠাবে না দ. কোরিয়া

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তীব্র চাপ ও আহ্বান সরাসরি নাকচ করে দিয়ে দক্ষিণ কোরিয়া সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা ইরান যুদ্ধে কোনো যুদ্ধজাহাজ, সেনা বা সামরিক সরঞ্জাম পাঠাবে না।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) রাজধানী সিউলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ং এই ঘোষণা দেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, এমন কোনো সেনা বা সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করা হবে না, যার মাধ্যমে আমরা কোনো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ি।
প্রেসিডেন্ট লি বলেন, দক্ষিণ কোরিয়াকে কোনোভাবে যুদ্ধের দিকে টেনে নিয়ে যেতে পারে- এমন কোনো সামরিক মোতায়েন করা হবে না। তিনি জোর দিয়ে বলেন, দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক সক্ষমতা বা যুদ্ধ সরঞ্জাম কোনোরূপেই যুদ্ধের কাজে ব্যবহারের জন্য মোতায়েন করা হবে না।
তবে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে নিজেদের বাণিজ্যিক নৌযান চলাচলের নিরাপত্তা বজায় রাখতে সিউল আরও বড় কোনো ভূমিকা রাখতে পারে কি না, তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বর্তমানে জলদস্যুতা বিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে সোমালিয়ার উপকূলে দক্ষিণ কোরিয়ার একটি নৌঘাঁটি ও সামরিক উপস্থিতি রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে লি জে মিয়ং জানান, বাণিজ্যিক জাহাজ, ক্রুড তেলের চালান ও নিজেদের নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে অন্যান্য দেশের মতো ন্যূনতম প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়াটা দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য অপরিহার্য। এর আগে ইরান যুদ্ধে দক্ষিণ কোরিয়া পর্যাপ্ত সামরিক সহায়তা দিচ্ছে না বলে সিউলের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
এমনকি, সিউলকে চাপে ফেলতে চলতি গ্রীষ্মে দুই দেশের সশস্ত্র বাহিনীর পূর্বনির্ধারিত বড় ধরনের যৌথ সামরিক মহড়া পর্যন্ত কাটছাঁট করেছিল যুক্তরাষ্ট্র, যা তাদের দীর্ঘদিনের মিত্র দেশটিকে বেশ উদ্বিগ্ন করে তোলে।
যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার এতদিন কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে সম্ভাব্য সামরিক বাহিনী মোতায়েনের বিষয়টি বিবেচনা করছিল। যদিও দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এই সিদ্ধান্তটি মোটেই গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেনি।
সংবাদ সম্মেলনে ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি সংক্রান্ত অগ্রগতি নিয়ে জানতে চাওয়া হলে প্রেসিডেন্ট লি জানান, পুরো প্রকল্পের বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতা ও বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তাটিই মূল বাধা হিসেবে কাজ করছে।
তিনি স্বীকার করেন যে, চুক্তির মধ্যে এমন কিছু শর্ত ছিল যা সিউলের পক্ষে সহজে মেনে নেওয়া কঠিন, তবে দু'পক্ষই একটি চূড়ান্ত সমঝোতার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
কোরীয় পণ্যের ওপর মার্কিন শুল্ক কমিয়ে ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনার বিনিময়ে গত বছর দক্ষিণ কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন খাতে ৩৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
বিনিয়োগ সংক্রান্ত এই জটিলতার কারণেই চলতি সপ্তাহে দেশটির পার্লামেন্টে নির্ধারিত একটি খসড়া ব্রিফিং স্থগিত করেছে সিউল, যা আগামী সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের মধ্যে আগামী মাসগুলোতে আবারও শীর্ষ বৈঠক হতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন। তবে এই বৈঠক বাস্তবায়নের জন্য অনেকগুলো কূটনৈতিক বিষয়কে এক সুতোয় গাঁথতে হবে বলে তিনি সতর্ক করেন।
তিনি স্পষ্ট করেন যে, ট্রাম্প উত্তর কোরিয়ার সাথে আবার সংলাপে বসতে আগ্রহী ও দক্ষিণ কোরিয়াও তাই চায়। উত্তর কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এই আলোচনাকে বাস্তবে রূপ দিতে সিউল প্রতিনিয়ত কূটনৈতিক সমন্বয় চালিয়ে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বারবার দ্বিপক্ষীয় আলোচনার প্রস্তাব দেওয়া হলেও উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত প্রায় নীরব ভূমিকা পালন করে আসছে।
তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, চলতি শরতের মধ্যেই কিম জং উনের সঙ্গে একটি বৈঠকে বসতে নিজের সহযোগীদের ওপর নিরবচ্ছিন্ন চাপ তৈরি করে যাচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।