দুইশ বছরের ঐতিহ্য আগলে মনিপাড়ায় বাঁশ-বেতের শিল্পীরা

আধুনিকতার স্রোতে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার বহু ঐতিহ্য। তবে সেই স্রোতের বিপরীতে সিরাজদিখান উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের মধুপুর মনিপাড়ার মানুষ আজও বুক দিয়ে আগলে রেখেছেন পূর্বপুরুষের রেখে যাওয়া বাঁশ ও বেতশিল্প। প্রায় দুইশ বছরের ঐতিহ্যকে ধারণ করে শত প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে আছে এই শিল্প। বংশপরম্পরায় প্রায় একশ পরিবার এখনো বাঁশ ও বেতের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছে।
ভোর হলেই শুরু হয় কারিগরদের কর্মব্যস্ততা। বাড়ির উঠান কিংবা ঘরের এক কোণে বসে বাঁশ ও বেত কেটে, চিরে, বুনে তৈরি করা হয় নিত্যপ্রয়োজনীয় ও শৌখিন নানা সামগ্রী। কারও হাতে তৈরি হচ্ছে ঝুড়ি, কারও হাতে ডালা, আবার কেউ তৈরি করছেন মোড়া, দোলনা, ফুলের টব, পাখা, ঝাড়ু ও নানা নকশার গৃহসজ্জার সামগ্রী।
এই শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অনেক পরিবারের গল্প প্রায় একই। দাদা ছিলেন কারিগর, বাবা ছিলেন কারিগর, এখন তারাও একই পেশায়। এমনকি পরবর্তী প্রজন্মের হাতেও উঠেছে বাঁশ-বেতের কাজ। অর্থের চেয়ে ঐতিহ্য ও বাপ-দাদার পেশার প্রতি ভালোবাসাই যেন তাদের এই শিল্প আঁকড়ে থাকার প্রধান কারণ।
বাঁশ ও বেতশিল্পের কারিগর যতিন কুমার দাস বলেন, ‘অতীতে কোনো সরকারই আমাদের এই শিল্পের প্রতি গুরুত্ব দেয়নি। ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাঁশ ও বেতের তৈরি পণ্যের চাহিদা রয়েছে। আমরা যদি কম খরচে সরকারি সহযোগিতায় এসব পণ্য দেশের বাইরে রপ্তানি করতে পারতাম, তাহলে আরও বেশি লাভবান হতে পারতাম।’
তবে কারিগরদের ভাষ্য, বর্তমানে এই শিল্পের সবচেয়ে বড় সংকট কাঁচামাল। বাঁশ ও বেত সংগ্রহ করতে তাদের দূর-দূরান্তে যেতে হয়। কুষ্টিয়া, সিলেট ও বরিশালসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে কাঁচামাল কিনে আনতে হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় পরিবহন খরচ। ফলে কাঁচামালের দাম ও উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও সে অনুযায়ী বাড়ছে না পণ্যের দাম।
অন্যদিকে আধুনিকতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্লাস্টিক ও ধাতব পণ্যের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বাঁশ-বেতের তৈরি সামগ্রীর বাজারও সংকুচিত হয়েছে। ফলে আগের মতো চাহিদা না থাকায় কমেছে আয়, দেখা দিয়েছে পেশাটিতে মন্দাভাব।
তবুও হার মানেননি মধুপুর মনিপাড়ার কারিগররা। লাভ কম, কাঁচামালের দাম বেশি—সব প্রতিকূলতা মেনে নিয়েও তারা ধরে রেখেছেন বাপ-দাদার পেশা। কারণ, তাদের কাছে এটি শুধু জীবিকার মাধ্যম নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পূর্বপুরুষের স্মৃতি, পারিবারিক পরিচয় ও দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য।
কারিগর নিরঞ্জন দাস বলেন, ‘সরকারিভাবে সহজ শর্তে ঋণ, কাঁচামাল সংগ্রহে সহায়তা, আধুনিক ডিজাইনের প্রশিক্ষণ ও উৎপাদিত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হলে এই শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে।’
নিরঞ্জন দাসের মতো আরও কয়েকজন কারিগরের সঙ্গে কথা বলে তাদের কণ্ঠে হতাশার ছাপ পাওয়া গেছে। প্রযুক্তির ব্যবহার ও আধুনিকতার ছোঁয়ায় দিন দিন বাঁশ-বেতের তৈরি পণ্যের ব্যবহার কমছে। ব্যবসায় মন্দাভাব থাকায় এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত পরিবারগুলোও পড়েছে দুর্দিনে। সময়ের সঙ্গে এই শিল্প তার আগের জৌলুস হারালেও দৃঢ় মনোবল নিয়ে এখনো বাঁশ-বেতের পণ্য তৈরি ও বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন তারা।
সিরাজদিখান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুম্পা ঘোষ বলেন, ‘সিরাজদিখানের একটি গ্রামে শতাধিক পরিবার বাঁশ ও বেতশিল্পের সঙ্গে জড়িত। বিষয়টি আমি অবগত আছি। সিরাজদিখানের মনিপাড়ার কারিগরদের হাতে তৈরি বাঁশ-বেতের প্রতিটি পণ্য শুধু একটি সামগ্রী নয়, এর সঙ্গে মিশে আছে শত বছরের ইতিহাস, শ্রম ও ভালোবাসা।
তিনি বলেন, ‘এই শিল্প বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্য। এ ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখা আমাদের দায়িত্ব। সরকারিভাবে কেউ সহযোগিতা নিতে চাইলে আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করব। পাশাপাশি এলাকায় এসব পণ্য বাজারজাত করার জন্যও উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
ভোরের আকাশ/সু.পা