সর্বাগ্রে প্রয়োজন বাংলাদেশপন্থি নাগরিক শ্রেণী গড়ে তোলা

একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ভিত্তি কেবল তার ভূখণ্ড, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়; বরং তার প্রাণভোমরা হলো দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ একদল নীতিবান ও বাংলাদেশপন্থি নাগরিক।
প্রায় বিশ কোটি জনসংখ্যার এই বাংলাদেশ আয়তনে ছোট হলেও বিশ্বের অষ্টম জনবহুল দেশ। শক্তির মাপকাঠি যদি কেবল আধুনিক অস্ত্র কিংবা বিপুল অর্থের বদলে জনসংখ্যা হতো, তবে বাংলাদেশ নিশ্চিতভাবেই বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি হিসেবে গণ্য হতো—যেমনটা বিশ্ব ক্রিকেটে এক অদম্য শক্তি হিসেবে বাংলাদেশ নিজের অবস্থান তৈরি করেছে।
কিন্তু আফসোসের বিষয়, এই বিশাল জনসংখ্যার নিজস্বতা, দেশপ্রেম ও জাতীয় আনুগত্য নিয়ে আজ গভীর প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। বৃহৎ এই জনগোষ্ঠীর মাঝে কতজন প্রকৃতপক্ষে হৃদয় দিয়ে ‘বাংলাদেশপন্থি’? কতজনই বা অগোচরে বাংলাদেশবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত? কতজন দেশকে নিজের প্রকৃত আবাস না ভেবে কেবল অর্থ উপার্জনের একটি উর্বর ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করছে? জন্ম এবং জীবনের দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে অতিবাহিত করলেও মননে মগজে তারা অন্য কোনো ভিনদেশের গুণকীর্তনে ব্যস্ত। আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে যখন বাংলাদেশের স্বার্থের সঙ্গে অন্য কোনো দেশের স্বার্থের সংঘাত বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হয়, তখন এদের একদল অসংকোচে নিজ দেশের বিপক্ষে অবস্থান নেয় । এবং পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে ভিনদেশের পক্ষে সুবিধাজনক বয়ান ও ন্যারেটিভ তৈরি করে। ক্রিকেট খেলায় কি আমরা তার ভুঁড়ি ভুঁড়ি প্রমাণ দেখি না? প্রচলিত লোকভাষার মতো, তাদের আচরণ এমন—বাংলাদেশ থেকে জীবন-জীবিকার রসদ নিচ্ছে, তাদের স্বার্থের প্রতি পিঠ দেখিয়ে অন্যের প্রতি অদ্ভুত এক অন্ধ তোষামোদ বহাল রেখেছে।
কোনো সরকারি বা বেসরকারি সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই যে, এই ভূখণ্ডে ঠিক কত শতাংশ মানুষ হৃদয় থেকে দেশকে ভালোবাসে আর কত শতাংশ নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থ ও পরজীবিতার কারণে ভিন্ন দেশের এজেন্ডা বাস্তবায়নে তৎপর। কিন্তু বর্তমান অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে এ জাতীয় একটি সুনির্দিষ্ট সমীক্ষা ও পরিসংখ্যান অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। কারা এ দেশের মাটি ও মানুষকে ভালোবাসে আর কারা ইতিহাসের মীর জাফরের আধুনিক রূপ নিয়ে চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তা চিহ্নিত করা না গেলে বাংলাদেশের সার্বিক নিরাপত্তা ও উন্নয়ন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে। অতীতে যেভাবে আর্থিক ও নিজস্ব স্বার্থের বিনিময়ে ভিনদেশি বেনিয়াদের হাতে বাংলার স্বাধীনতা তুলে দেওয়া হয়েছিল, সে ইতিহাস যেন আর নতুন করে ফিরে না আসে। ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধ কিংবা তার পরবর্তী ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শোষণের ইতিহাস আমাদের সতর্ক করে যে, ঘরের ভেতরের বিভীষণরা বাইরের শত্রুর চেয়েও অনেক বেশি বিপজ্জনক।
আজ আমাদের সাহসের সঙ্গে খুঁজে বের করতে হবে—কারা এই দেশের রক্তঘামে অর্জিত সম্পদ বিদেশে পাচার করে কানাডায় ‘বেগমপাড়া’ তৈরি করেছে? কারা বাংলাদেশের রক্ত চুষে দেশকে রক্তশূন্যতায় পরিনত করছে। কারা নিজেদের জন্য নিরাপদ আস্তানা গেড়েছে দুবাই, মালয়েশিয়া বা সিঙ্গাপুরে? কাদের প্রধান আকর্ষণ হয়ে উঠেছে বিদেশে ‘সেকেন্ড হোম’? দেশের অর্থনৈতিক মূলভিত্তি ধ্বংস করে যারা বিদেশে নিজেদের আয়েশি জীবন নিশ্চিত করছে, তাদের কাছে দেশের অস্তিত্ব ও সার্বিক কল্যাণ গৌণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো সংকটে পড়লেই বা সুযোগ পেলেই যারা দিল্লি, কলকাতা, আগরতলা কিংবা ইসলামাবাদ ও করাচির মতো জায়গায় ছুটে যায় এবং নিজ দেশের চেয়ে সেসব দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়—তাদের মূল উদ্দেশ্য ও গোপন স্বার্থ উন্মোচন করা দরকার। একইভাবে, জাতীয় স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে কোনো বিশেষ বৈশ্বিক পরাশক্তি—যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া কিংবা চীনের প্রতি অন্ধ তোষামোদি করার প্রবণতাও একধরনের মানসিক দাসত্ব।
অন্য কোনো দেশের প্রতি যদি কারও এতই অন্ধ ভালোবাসা, আনুগত্য ও তোষামোদের মোহ থাকে, তবে এই অগণিত সাধারণ মানুষের দেশে পরজীবী হিসেবে তাদের পড়ে থাকার কোনো নৈতিক অধিকার থাকতে পারে না। যদি এই মাটি ও ভূখণ্ডকে তারা নিজেদের বলে দাবি করতে চায়, তবে যেকোনো দেশের দালালি, দ্বিচারিতা ও আত্মপ্রতারণা ত্যাগ করা ব্যতিরেকে বিকল্প নেই। বাংলাদেশকে আর কোনো মীর জাফরি বা তোষামোদির চারণক্ষেত্র হতে দেওয়া যায় না।
অবকাঠামো, উড়ালসড়ক, কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান দিয়ে কোনো রাষ্ট্র দীর্ঘদিন সার্বভৌম ও মাথা উঁচু করে টিকে থাকতে পারে না, যদি না তার পেছনে থাকে গভীর দেশপ্রেমে বলীয়ান ‘বাংলাদেশপন্থি’ নাগরিক সমাজ। দেশের চলমান অস্তিত্ব রক্ষায়, সার্বভৌমত্ব সুসংহত করতে এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আজ সর্বাগ্রে প্রয়োজন নীতিবান, অনুগত ও বাংলাদেশপন্থি নাগরিক শ্রেণী গড়ে তোলা।
লেখক: খোন্দকার কাওছার হোসেন
সম্পাদক, দৈনিক ভোরের আকাশ।
ভোরের আকাশ/ এনউব