মওলানা ভাসানীর মানবিক দর্শনের জীবন্ত স্মারক ‘মুসাফিরখানা’

পকেটে টাকা নেই, মাথার ওপর ছাদ নেই—তবু একবেলা খাবার কিংবা নিরাপদ আশ্রয় নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হয় না দূরদূরান্ত থেকে আসা পথচারী, অসচ্ছল মানুষ ও ভক্ত-অনুসারীদের। প্রায় ৮০ বছর ধরে টাঙ্গাইলের সন্তোষে তাঁদের বিনা মূল্যে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে আসছে ঐতিহাসিক মুসাফিরখানা। মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর মানবিক দর্শন ও জনকল্যাণমূলক চিন্তার জীবন্ত স্মারক হয়ে টিকে আছে প্রতিষ্ঠানটি।
১৯৪৬ সালে মওলানা ভাসানী নিজ হাতে এই সেবাশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। কৃষক, শ্রমিক ও নিপীড়িত মানুষের অধিকার আদায়ে আজীবন সংগ্রাম করা এই নেতার সাধারণ মানুষের প্রতি মমত্ববোধের প্রতিফলন আজও দেখা যায় সন্তোষের মুসাফিরখানায়। সময়ের পরিবর্তন ও নানা আর্থসামাজিক প্রতিকূলতার মধ্যেও প্রতিষ্ঠানটি তার মানবিক কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।
এটি কেবল একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান নয়; বরং সমতা, ভ্রাতৃত্ব ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠায় মওলানা ভাসানীর আদর্শেরও প্রতীক। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষের পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশ থেকেও অনেকে এখানে আসেন। তাঁদের কাছে মুসাফিরখানাটি হয়ে উঠেছে ভাসানীর জীবন, আদর্শ ও মানবিকতার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার অন্যতম স্থান।
সম্প্রতি ভারতের আসামের লক্ষ্মীপুরের গোয়ালপাড়া থেকে তিন ব্যবসায়ী সন্তোষে আসেন। তাঁদের একজন মনিরুজ্জামান নিজের অনুভূতি জানিয়ে বলেন, তাঁদের পূর্বপুরুষেরা ভাসানী হুজুরের অনুসারী ছিলেন। তাঁদের কাছ থেকে হুজুরের অনেক গল্প শুনেছেন। এবার সন্তোষে এসে মুসাফিরখানায় যে আতিথেয়তা ও সেবা পেয়েছেন, তা অসাধারণ। টাঙ্গাইলে এসে তাঁদের খুব ভালো লেগেছে।
উত্তরবঙ্গ থেকে ঘুরতে আসা ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম বলেন, মুসাফিরখানার নিবেদিতপ্রাণ কর্মীরা অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করছেন। এখানে এসে প্রথমেই তিনি মওলানা ভাসানীর মাজার জিয়ারত করেছেন। বাবা-মায়ের কাছে ভাসানীর গৌরবময় ইতিহাস শুনে বড় হয়েছেন তিনি। আগে শুনতেন, ভাসানীর প্রতিষ্ঠিত মুসাফিরখানায় থাকা-খাওয়ার জন্য কোনো টাকা লাগে না। এবার এসে সেই কথার বাস্তব প্রমাণ পেয়েছেন।
প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ভক্ত-অনুসারীদের খাবারের ব্যবস্থা দেখভাল করেন আমেনা বেগম। তিনি জানান, দর্শনার্থীরা এখানে এসে মওলানা ভাসানীর মাজারসহ বিভিন্ন স্থাপনা পরিদর্শন করেন। কেউ নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী বাজার করে নিয়ে আসেন, আবার অনেকে আসেন খালি হাতে। তবে কে কী অবস্থায় এসেছেন, তা বিবেচনা না করে সবার জন্যই সাধ্যমতো খাবারের ব্যবস্থা করা হয়।
মুসাফিরখানার রান্নাঘরে প্রায় ৬০ বছর ধরে নিরলসভাবে কাজ করছেন চান মিয়া। তাঁর ভাষ্য, প্রতিদিন নিয়মিত দুবেলা খাবার পরিবেশন করা হয়। এ ছাড়া প্রতি বৃহস্পতিবার ও চান্দ্র মাসের ১১ তারিখে বিশেষ তবারক বিতরণ করা হয়। এসব দিনে দূরদূরান্ত থেকে বিপুলসংখ্যক ভক্তের সমাগম ঘটে। এখানে আসা মানুষের জন্য বিনা মূল্যে থাকা ও খাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
মওলানা ভাসানীর দৌহিত্র ও ন্যাপ ভাসানীর সভাপতি হাসরত খান ভাসানী বলেন, ১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রায় ৮০ বছর ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে মুসাফিরখানার কার্যক্রম চলছে। মূলত হুজুরের মুরিদান, ভক্ত ও এখানে আসা সাধারণ মানুষের আন্তরিক সহযোগিতায় এই উদ্যোগ এখনো সচল রয়েছে।
মওলানা ভাসানীর মানবিক দর্শনের কথা স্মরণ করে তিনি আরও বলেন, ভাসানী হুজুর বলতেন, তাঁর দরগায় কেউ এলে তাকে যেন অন্তত একটি রুটি দেওয়া হয়। সেই নির্দেশনা অনুসরণ করেই আজ পর্যন্ত এখান থেকে কাউকে ক্ষুধার্ত মুখে ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি। আল্লাহর রহমতে ভবিষ্যতেও এ সেবামূলক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
মুসাফিরখানা পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এবিএম শহিদুল ইসলাম জানান, মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর স্মৃতি ও আদর্শ ধারণ করে তাঁর হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় সংগঠনগুলোকে নতুন করে উজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। বিশেষ করে ঐতিহাসিক মুসাফিরখানাটির আধুনিকায়ন অগ্রাধিকার পাবে, যাতে দূরদূরান্ত থেকে আসা মানুষ আরও সহজে ও সুচারুভাবে সেবা নিতে পারেন।
উপাচার্য আরও বলেন, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বমানের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উন্নীত করাও তাঁদের অন্যতম লক্ষ্য। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা গবেষণা ও মেধার মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে অবদান রাখবেন। পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জন করে বিশ্বপরিসরে নিজেদের যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখবেন—এমন প্রত্যাশার কথাও জানান তিনি।
দীর্ঘ আট দশক ধরে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সন্তোষের এই মুসাফিরখানা তাই শুধু বিনা মূল্যে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা নয়; এটি মানবিকতা, সহমর্মিতা ও মানুষের প্রতি ভালোবাসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
ভোরের আকাশ/সু.পা