পাবনায় পাট চাষে সোনালী স্বপ্ন দেখছেন চাষীরা

পাবনা জেলায় এ বছর পাটের ফলন এবং রং ভালো হওয়ায় কৃষকেরা সোনালী স্বপ্ন দেখছেন। বর্তমানে যে বাজার রয়েছে সেটা ঠিক থাকলে কৃষকের কিছুটা লাভবান হবেন বলে আশা করা যাচ্ছে। তবে শুরুর দিকে থেকে বর্তমানে পাটের বাজারে দরপতন ঘটায় অঞ্চল ভেদে কৃষকেরা দাম নিয়ে চিন্তিত। পাটের ভরাভরি মৌসুমে আরো দর পতন ঘটলে লোকসান হবে বলে আশঙ্কা করছেন পাট চাষীরা। কৃষিবিভাগ বলছে, পাটের ভালো ফলনের পাশাপাশি এবছর পাটের যে বাজার আছে সেটা স্বাভাবিক। এতে কৃষকেদর লোকসান হবে না বরং তারা লাভভান হরবন।
পাবনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে পাবনায় লক্ষমাত্রার চেয়ে ৭২৫ হেক্টার বেশি জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। জেলায় ৫ লাখ ৫৮ হাজার ৯৮৭ বেল বা ২৫ লাখ ৪৬ হাজার ৮৮৪ মন পাট উৎপাদনের লক্ষমাত্রা নিয়ে আবাদের লক্ষমাত্রা ধরা হয় ৪২ হাজার ৬৯০ হেক্টার জমিতে। সেখানে আবাদ হয়েছে ৪৩ হাজার ৪১৫ হেক্টর জমিতে। গত বছরের তুলনায় ৭৫০ হেক্টর জমিতে বেশি আবাদ হয়েছে। জেলায় গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত পাট কর্তন হয়েছে ৩৩ হাজার ১১৬ হেক্টর জমির।
কৃষি বিভাগ সূত্র আরো জানায়, চলতি বছরে আবহাওয়া অনূকুলে থাকায় পাট আবাদের জন্য বেশ উপযুক্ত ছিল। আবাদ শুরু থেকে কর্তন পর্যন্ত কৃষকদের পাট চাষ নিয়ে কোন সমস্যায় পড়তে হয়নি। এ অঞ্চলে জেআরও ৫২৪, মহারাষ্ট্র, ও-৯৮৯৭, রবি-১সহ কয়েকটি জাতের পাটের আবাদ হয়ে থাকে। মৌসুমের শুরুতে পাট বিক্রি হয়েছে ৪ হাজার ২শ’ টাকা থেকে ৪ হাজার ৫শ’ টাকা পর্যন্ত। এখন পাটের ভরাভরি মৌসুমেও পাটের বাজার ৩ হাজার ২শ’ থেকে ৩ হাজার ৮শ’ টাকা মন। পাবনা সদর, আটঘরিয়া, চাটমোহর, সাঁথিয়া, ভাঙ্গুড়া উপজেলাসহ জেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষকেদর সাথে কথা বলে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে পাটের ফলনে তারা আনন্দিত।
এবছর বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন নদী-নালা, খাল-বিলে পানি থাকায় তাদের পাট জাগ (পঁচানো) দিতে কোন সমস্যা হচ্ছে না। অধিক পানি থাকায় পাটের সোনালী রং উজ্জ্বল এবার ফুটে উঠেছে। পাট কাটা থেকে শুরু করে শুকানো পর্যন্ত কৃষকদের নারী-পুরুষ সবাইকে অনেক কষ্ট করতে হয় বলে কৃষকরা জানান। তবে অঞ্চল ভেদে পাটের রং এবং ফলন কম-বেশি হয়ে থাকে। পঁচানোর সময় বেশি পানি থাকলে এবং শুকানোর সময় সূর্যের তাপ বেশি থাকলে পাটের সোনালী রং উজ্জ্বল হয়ে থাকে।
কৃষকেরা আরো জানান, জমি থেকে পাট কাটা, নদী বা জলাশয়ে জাগ দেওয়া, ছাড়ানোর জন্য অনেক শ্রমিক প্রয়োজন হয়। এজন্য এক বিঘা জমিতে ১৪ হাজার থেকে ১৬ হাজার টাকা খরচ লাগে। এছাড়া অঞ্চল ভেদে এবং জমি থেকে জলাশয়ের দুরত্ব ভেদে আরো বেশি বা কম খরচ লেগে থাকে। সব মিলে এক বিঘা জমিতে পাট আবাদ করতে ২০-২৫ হাজার টাকা খরচ হয়ে থাকে।
পাবনা সদর উপজেলার চক-উগ্রগড় গ্রামের জালাল উদ্দিন জানান, ‘পাটের এখন বাজার যাচ্ছে ৩২শ’থেকে ৩৮শ’ টাকা। এক বিঘা জমিতে পাট চাষ করতে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়ে থাকে। যাদের ফল ভালো হয়েছে তারা কিছুটা লাভ হবে।’
উপজেলার মালঞ্চী গ্রামের কৃষক রবিউল ইসলাম জানান, ‘আমি ২ বিঘা জমিতে পাটের আবাদ করেছি। এবছর পাটের ফলন ভালো হচ্ছে। এলাকায় পানি বেশি থাকায় পাটের রং সোনালী হচ্ছে।’পাবনা ইছামতি নদীতে পাট ছাড়ানোর কাজ করছিলেন সদর উপজেলার ইসলামপুর গ্রামের কৃষক লিয়াকত হোসেন। তিনি জানান, ‘এবছর বিঘা প্রতি ৬ থেকে ১০ মন পর্যন্ত পাট উৎপাদন হচ্ছে। তবে
পাটের বাজার দিন দিন কমে যাচ্ছে। এজন্য তারা কিছুটা চিন্তিত রয়েছেন।
সাঁথিয়া উপজেলার বোয়ালমারী গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘পাট চাষে শুরুর দিকে তেমন কোন শ্রম দিতে হয় না। জমি থেকে কর্তন, পরিবহন, নদী বা জলাশয়ে জাগ দেওয়া, ছাড়ানো এবং শুকানো পর্যন্ত কৃষদের কষ্টের শেষ থাকে না। সেক্ষেত্রে ভালো দাম পেলে কৃষকদের কষ্ট স্বার্থক হয়। আমি এবছর ৩ বিঘা জমিতে পাটের আবাদ করেছি। প্রতি বিঘায় কমপক্ষে ২০ হাজারা টাকা করে খরচ
হয়েছে।’
ভাঙ্গুড়া উপজেলার পাট চাষী শাহ আলী জানান, এবারের পাটের দাম মোটামুটি ভালো। প্রতি মন পাট ৩ হাজার ৬শ’ থেকে ৩ হাজার ৮শ’ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। এছাড়াও ১’শ আটি পাট কাঠি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।’ একই উপজেলার পাটুলি পাড়া গ্রামের বাহের আলী জানান, ‘গত বছরের তুলনায় এবছর পাটের দাম ভালো। তবে কোন কোন এলাকায় পানি কম হওয়ার কারণে পাটের আঁশ সংগ্রহে কিছুটা বেগ পোহাতে হচ্ছে।’
ভাঙ্গুড়া বাজারের পাট ব্যবসায়ী আব্দুল খালেক, জাহাঙ্গীর হোসেন ও মুকুল হোসেন জানান, ‘এখন পর্যন্ত পাটের ভরাভরি মৌসুম লাগেনি। আর কয়েকদিন পরে পাটের ভরা ভরি মৌসুম লাগবে। তবে এলাকা এবং কোয়ালিটি ভেদে পাটের দাম প্রতি মন ৩ হাজার ৫শ’ টাকা থেকে ৩ হাজার ৮শ’ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
ভোরের আকাশ/সু.পা