শতবর্ষের লোকঐতিহ্য ‘পাতা’ খেলায় মুখর গাইবান্ধা

গ্রাম-বাংলার হারিয়ে যেতে বসা লোকঐতিহ্যের অন্যতম অনুষঙ্গ ‘তান্ত্রিক পাতা খেলা’। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদনের ভিড়ে প্রায় বিলুপ্তির পথে থাকা এই শতবর্ষী লোকখেলাকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে গাইবান্ধায় আয়োজন করা হয়েছে ব্যতিক্রমধর্মী এক প্রতিযোগিতার। খেলাকে ঘিরে পুরো এলাকায় তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ।
সম্প্রতি গাইবান্ধা সদর উপজেলার বল্লমঝাড় ইউনিয়নের জোদ্দোকড়িশিং গ্রামে স্থানীয় যুবকদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী ‘পাতা খেলা’।
প্রতিযোগিতায় জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে পাঁচটি গুনিক দল অংশ নেয়। খেলা দেখতে শিশু, কিশোর, তরুণ, নারী ও প্রবীণসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষের ভিড় জমে। একপর্যায়ে পুরো এলাকা পরিণত হয় প্রাণবন্ত লোকজ উৎসবে।
খেলার নিয়মও বেশ ব্যতিক্রমী। খোলা মাঠের মাঝখানে ঢুলিয়ার ঢোলের তালে নাচেন ‘তুলা রাশির’ একজন ব্যক্তি, যাকে স্থানীয় ভাষায় ‘পাতা’ বলা হয়। মাঠের চারপাশে গোল হয়ে বসেন বিভিন্ন গুনিক দলের সদস্যরা। এরপর শুরু হয় তন্ত্র-মন্ত্র উচ্চারণ। প্রতিটি দল নিজেদের আধ্যাত্মিক শক্তির মাধ্যমে পাতাকে নিজেদের দিকে আকর্ষণ করার চেষ্টা করে। যে দল পাতাকে সবচেয়ে বেশি নিজেদের দিকে টেনে আনতে সক্ষম হয়, সেই দলকেই বিজয়ী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
খেলা দেখতে আসা দর্শক শাকিল মিয়া বলেন, আধুনিকতার যুগে এমন ঐতিহ্যবাহী লোকজ খেলা খুব একটা দেখা যায় না। তাই এ ধরনের আয়োজন তাদের জন্য যেমন আনন্দের, তেমনি নতুন প্রজন্মের জন্যও গ্রামীণ সংস্কৃতি জানার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
সাত বছর বয়সী দর্শক আশিক মিয়া বলেন, আগে পাতা খেলার নাম শুনেছিলাম। তবে এবারই প্রথম সরাসরি দেখলাম। খেলাটি তার কাছে বেশ মজার লেগেছে।
আরেক দর্শক লিয়ন মিয়া বলেন, তাদের গ্রামে আগে কখনো পাতা খেলা হয়নি। তাই আগ্রহ নিয়ে প্রথমবারের মতো খেলাটি দেখতে এসেছেন।
৭৩ বছর বয়সী দর্শক শাহাজাদা ব্যাপারী বলেন, ছোটবেলায় পাতা খেলা ছিল বেশ জনপ্রিয়। আগে বিভিন্ন গ্রামে নিয়মিত এ খেলার আয়োজন হতো। কিন্তু কালের বিবর্তনে এখন আর তেমন দেখা যায় না। তাই অনেক দিন পর খেলার আয়োজনের খবর পেয়ে তিনি দেখতে ছুটে এসেছেন।
অংশগ্রহণকারী গুনিকদের দাবি, এই খেলার ইতিহাস বহু পুরোনো। এটি শুধু বিনোদনের খেলা নয়; বরং গ্রামীণ লোকবিশ্বাস, আধ্যাত্মিক চর্চা ও লোকসংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের বিশ্বাস, তন্ত্র-মন্ত্রের শক্তির মাধ্যমেই পাতাকে বশ করে জয় নিশ্চিত করা সম্ভব।
আয়োজক কমিটির সদস্য বাপ্পি মিয়া বলেন, মোবাইল ফোন ও প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদনের কারণে গ্রাম-বাংলার অনেক ঐতিহ্যবাহী খেলা হারিয়ে যাচ্ছে। হারিয়ে যাওয়া সেই ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনা ও নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচিত করতেই এ আয়োজন করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও প্রতিবছর এ আয়োজন অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতারও দাবি জানান তিনি।
বল্লমঝাড় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জুলফিকার রহমান বলেন, গ্রামীণ ঐতিহ্য ও লোকসংস্কৃতি সংরক্ষণে এ ধরনের আয়োজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত লোকজ খেলার আয়োজন করা গেলে নতুন প্রজন্ম নিজেদের শেকড় ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারবে। একই সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য সংরক্ষণেও এটি ভূমিকা রাখবে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, গ্রাম-বাংলার লোকঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন নিয়মিত চর্চা, গবেষণা ও পৃষ্ঠপোষকতা। তান্ত্রিক পাতা খেলার মতো আয়োজন শুধু বিনোদনের সুযোগই তৈরি করে না, বরং নতুন প্রজন্মকে নিজেদের শেকড়, ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার একটি মাধ্যম হিসেবেও ভূমিকা রাখে।
ভোরের আকাশ/জেআ